লেখকের ডায়রি

লালগালিচাই সব কথা নয়

কান কথা-২
মেঘদূত রায়

২৪ মে, ২০১৯

কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাশের দেশ ভারতের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। প্রতি বছরই এই উৎসবের লাল গালিচায় বলিউড অভিনেত্রীদের দেখা যায়। তাদের পোশাক আর অলংকারের ঝলকানিতে দিশেহারা হয়ে যায় সব। সবার মনের মধ্যে কানে ভারতের অংশগ্রহণ দেখা দেয় বড় করে। কিন্তু এর উল্টো পিঠে আছে এক মস্ত শোঁকগাথা।

কানের লাল গালিচায় ভারতীয় তারকারা ঝলমলিয়ে উঠলেও সেকেবল পণ্যদূতের কল্যাণেই। কানের মূল আসর উৎসবের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় গত কয়েক বছর থেকেই নেই ভারতীয় ছবির অংশগ্রহণ। ভারতীয় গণমাধ্যমে এ নিয়ে আফসোসের শেষ নেই। সেই খেদ কিছুটা দেখা গেল প্রখ্যাত অভিনেত্রী শাবানা আজমীর মুখেও। তিনি কয়েক বছর আগে একটি টুইটে লিখেছিলেন ‘১৯৭৬ সালে নিশান্ত মনোনীত হয়। তখন সবকিছু ছিল বেশ সাধারণ। ছবিই ছিল উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, পোশাক নয়।’


এবারের কান উৎসবেও বলিউড তারকাদের কমতি ছিল না। প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার ছিল অভিষেক। তাই তার উচ্ছ্বাসটা একটু বেশি। ছিলেন কঙ্গনা রনৌত, দীপিকা পাড়ুকোন, হুমা কুরেশি, ডিয়ানা পেন্টি, হিনা খান ও বরাবরের আকর্ষণ ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন। অনেক বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির কানে এমন খরা নিয়ে লেখালেখি হয়েছে এ বছরও। আফছোছ করেছেন নির্মাতারা। আশ্বাস দিয়েছেন এমন করেই সামনে প্রতিযোগিতায়ও নাম লেখাবে ভারতীয় সিনেমা।

অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন, নিজের দেশ রেখে ভারতের সিনেমা নিয়ে আপনি কথা বলার কে? তাদের কাছে বলি। বাংলাদেশ কান চলচ্চিত্র উৎসবে বলার মতো কোনো খবর এখনো তুলতে পারেনি। তাই এই লেখাটা পাশের দেশের বড় ইন্ডাস্ট্রিটা নিয়েই। তবে বর্তমানে কানে ভারতীয় সিনেমার এমন দশা হলেও, ইতিহাস কিন্তু ভিন্ন। চলুন ঘুরে আসি সেখান থেকে।


ভারতীয় সিনেমা বিভিন্ন সময় অংশগ্রহণ করেছে এই মর্যাদাকর চলচ্চিত্র উৎসবে। কানের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নানা সময়ে ভারতের সিনেমাগুলো অংশগ্রহণ করেছে। ২০১৩ সালে ৬৬তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে পালিত হয় ভারতীয় সিনেমার ১০০ বছর পূর্তি। এ ছাড়া ২০১৭ সালে সিনেফন্ডেশন বিভাগে মনোনীত হয় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার ছাত্রী পায়েল কাপাডিয়ার স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি আফটারনুন ক্লাউডস।

তবে কান চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলার জয়জয়কারই সবচেয়ে বেশি। সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী পায় ‘বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্টারি’হিসেবে পাম দ’র পুরস্কার। ১৯৮৮ সালে মিরা নায়ারের সালাম বোম্বে ক্যামেরা দ‘র পুরস্কার পান। আর শেষ অফিশিয়াল পাম দ‘রের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিল সাজি এন কারুনের `স্বহাম‘ সিনেমাটি।


প্রথম আসরেই কেল্লাফতে

১৯৪৬ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ। কান চলচ্চিত্র উৎসবের সূচনাকাল। প্রথম আসরেই ‘গ্রাঁ প্রি দু ফেস্তিভাল এন্তারন্যাশনাল দু ফিল্ম’পুরস্কার জিতে নেয় ভারতীয় একটি সিনেমা। চেতন আনন্দের ছবি নীচা নগর জিতে নেয় সেরা সম্মাননাটি। সেকালের ‘গ্রাঁ প্রি‘-ই আজ পাম দর নামে পরিচিতি। এ ছাড়া ১৯৫২ সালে আর ভি সান্তারামের সিনেমা অমর ভোপালি মনোনীত হয়। ১৯৫৫ সালে পাম দ’র বিভাগে মনোনীত হয় বুট পলিশ সিনেমাটি। শিশু অভিনেতা নাজ বিশেষ পারফরমেন্স পুরস্কার জিতে নেয়। ১৯৫৬ সালে রাজবংশ খান্নার প্রামাণ্যচিত্র গোটোমা দ্য বুড্ঢা পায় জুরি পুরস্কার।


বাংলাই ভারতের আরেক পরিচিতি

শুধু কান চলচ্চিত্র উৎসবই নয়, বিশ্বের বড় বড় চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলা সিনেমা ও পরিচালকদের অবদান অনেক উপরে। তাদের সিনেমা দিয়েই বাইরের চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে ভারতীয় সিনেমার প্রচার হয়েছে। এই কাতারে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক কুমার ঘটক, মৃণাল সেন, বিমল রায়দের নাম অবলিলায় বলা যায়।

১৯৫৪ ও ১৯৫৫ সালে পরপর দুইবছর বিমল রায়ের ছবি দো বিঘা জমিন ও বিরাজ বহু মনোনীত হয় পাম দ’র বিভাগে। এরপর সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী পায় ‘বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্টারি’ হিসেবে পাম দ’র পুরস্কার।

বিভিন্ন বছরে কান চলচ্চিত্র উৎসবের নানা বিভাগে মনোনীত হওয়া বাংলা চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে আছে সত্যজিৎ রায়ের ঘরে-বাইরে, পরশপাথর, দেবী ও গণশত্রু এবং বিমল রায়ের সুজাতা, মৃণাল সেনের একদিন প্রতিদিন। মৃণালের ছবি খারিজ জুরি পুরস্কার জেতে এবং খণ্ডহর দেখানো হয় ‘আঁ সার্তে রিগা’ বিভাগে। গৌতম ঘোষের অন্তর্জলি যাত্রা ও গুড়িয়া এবং সন্দীপ রায়ের উত্তরণ। ‘কানস ক্ল্যাসিক’ হিসেবে দেখানো হয় সত্যজিৎ রায়ের চারুলতা ছবিটি।


আরও যেসব ভারতীয় সিনেমা

এ ছাড়া ভারতীয় হিন্দিসহ নানা অঞ্চলিক ভাষার সিনেমা এই গুরুত্বপূর্ণ উৎসবে অংশগ্রহণ করেছে। আহমেদ আব্বাসের পরদেশি, মনি ভট্টাচার্যের মুঝে জিনে দো, এম এস সাত্থুর গরম হাওয়া, সাজি এন কারুনের স্বহাম, শ্যাম বেনেগালের নিশান্ত মনোনীত হয় পাম দ’র বিভাগে। সাজি এন কারুনের স্বহামই এখন পর্যন্ত পাম দ‘রে মনোনীত হওয়া ভারতীয় শেষ সিনেমা।

এ ছাড়া পাম দ’রে খুব একটা সুবিধা করতে না পারলেও ভারতীয় তারকা ও সিনেমাওয়ালাদের নিয়মিত যাতায়াত এই আসরটি। অন্যান্য কিছু বিভাগেও জিতে নেয় পুরস্কার। মীরা নায়ারের সালাম বোম্বে এবং মুরালি নায়ারের মারান সিমহাসানাম জিতে নেয় ক্যামেরা দ’র। এই বিভাগে বিশেষ পুরস্কার পায় সাজি এন কারুনের পিরাভি এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরিচালক দীপা মেহতার ছবি স্যাম অ্যান্ড মি। যদিও সিনেমাটি মনোনীত হয় কানাডার সিনেমা হিসেবে। আসিফ কাপাডিয়ার স্বল্পদৈর্ঘ্য দ্য শিপ থিফ ‘সিনেফন্ডেশন অ্যাওয়ার্ড’ জেতে। ছবিটি যুক্তরাজ্যের হয়ে লড়াই করে। মনীশ ঝার স্বল্পদৈর্ঘ্য আ ভেরি ভেরি সাইলেন্ট ফিল্ম জিতে নেয় জুরি প্রাইজ।

কানের আঁ সার্তে রিগা বিভাগে বিভিন্ন সময় দেখানো হয় ভারতীয় অন্যান্য আঞ্চলিক ছবিও। এর মধ্যে আছে মণিপুরি পরিচালক আরিবাম সেয়াম শর্মার ইশানৌ, সাজি এন কারুনের বাণাপ্রস্থাম, সুশান্ত মিশ্রর ইন্দ্রধনুরা চাই, মুরালি নায়ারের আরিমপারা, অসিম আলুওয়ালির মিস লাভলি, কানু বেলের তিতলি, নিরাজ ঘেওয়ানের মাসান ও গুরবিন্দার সিংয়ের চৌথি কোট। আঁ সার্তে বিভাগে দেখানো হয় নন্দিতা দাসের মান্টোও।


আউট অব কমপিটিশন বিভাগে দেখানো হয় দেবদাস ও মুনসুন শুটআউট। বিশেষ প্রদর্শনী বিভাগে দেখানো হয় বোম্বে টকিজ। অনুরাগ কাশ্যপের গ্যাংস অব ওয়াসিপুর-এর দুই কিস্তি ও আগলি দেখানো হয় ডিরেক্টরস’ ফোর্টনাইট বিভাগে। পেডেলারস ও দ্য লাঞ্চবক্স দেখানো হয় ইন্টারন্যাশনাল ক্রিটিকস উইকে।
এ ছাড়া ২০১৩ সালে উৎসবের পর্দা উঠে অমিতাভ বচ্চনের হাতে। বিদ্যা বালান ও নন্দিতা দাস অংশগ্রহণ করেছিলেন কানের বিচারক হিসেবে। কানের প্রতিযোগিতা বিভাগের মনোনয়ন তালিকায় বলিউডের সিনেমা নেই, এ সত্যি। তবে কান যে সিনেমা ফেরিওয়ালাদের বড় বাজার, এ খবর আছে বলিউডের কাছে। আঞ্চলিক ছবি থেকে শুরু করে বলিউড-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভিড় জমাচ্ছেন মার্শ দু ফিল্মে (কানের সিনেমা বাজার)। তাদের আশা একদিন নিয়মিতই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবে ভারতীয় ছবি।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে দৈনিক প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, এনডিটিভি, হিন্দুস্তান টাইমস, হাফিংটন পোস্ট, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, নিউজ ১৮, টুইটার ও কান চলচ্চিত্র উৎসবের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট-এর সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।