লেখকের ডায়রি

মন্দা ও বৈচিত্র্যময় নির্মাণের বছর

সালতামামি ২০১৯ (বাংলা চলচ্চিত্র)
মারুফ হাসান ইমন

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯

সপ্তাহখানেক আগে রাজধানীর কাকরাইলের রাজমণি সিনেমা হলের সামনে দিয়ে যাই। মনটা খারাপ হয়ে যায়। দুই দশক আগেও এই হলটি ছিলো দেশের সিনেমা প্রদর্শন কিংবা বিপণনের প্রাণকেন্দ্র। সিনেমার অনেক সোনালী সময়ের সাক্ষী এই প্রেক্ষাগৃহ। অথচ আজ এটি ভেঙে ফেলা একটি ভবন ছাড়া আর কিছুই নয়।

শুনেছি এখানে পরবর্তী যে ভবন বানানোর কথা সেখানে সিনেমা হলের কোন ঠাঁই হবে না। এটি শুধু রাজমণি কিংবা রাজিয়া নয়, দেশের অনেক একক পর্দার সিনেমা হলের জন্যই সত্য। খুব সম্ভব সারাদেশের হলের সংখ্যা দেড়শোর কাছাকাছি নেমে এসেছে। কিছুটা ভালোও লাগে যখন মহাখালী ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে যাবার সময় এসকেএস টাওয়ারের স্টার সিনেপ্লেক্সের পোস্টার দেখি।

২০১৯ সালটি সব মিলিয়ে বাংলাদেশে নির্মিত ছবির জন্য ব্যবসার দিক থেকে যতটা বাজে, নির্মানের দিক থেকে কিছুটা হলেও বৈচিত্র্যপূর্ণ বছর। আসুন একটু ভাল-মন্দ কাটাছেড়া করা যাক।

সংখ্যায় ২০১৯ সাল
এই বছরে মুক্তি পেয়েছে মাত্র ৪৫টি চলচ্চিত্র। যেখানে ২০১৮ সালে মোট ৫৬টি ছবি মুক্তি পেয়েছিল। মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলোর ৯৯ ভাগই লগ্নি তুলে আনতে পারেনি, হাতেগোনা দুয়েকটি বাদে এবং এটাই সত্য। বেশ কয়েকটি ছবি আলোচনায় ছিল ঠিকই তবে মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। যৌথ প্রযোজনায় এ বছর শুধু প্রেম আমার ২ মুক্তি পেয়েছে তাও ২০১৮ তে সেন্সর সনদ পাওয়া।

জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আবদুল আজিজ ব্যক্তিগত মামলায় আত্মগোপনে থাকায় তাঁকে সিনেমাপাড়ায় দেখা যায়নি। মাসুদ রানা সিনেমা নিয়ে অনেক জলঘোলা হলেও বছর শেষেও এর কলাকুশলী নিয়ে কোন নিশ্চয়তা দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। তাই এই প্রতিষ্ঠান শুধু অন্যের ছবি প্রচারণা ও বিতরণের কাজেই বছর শেষ করেছে। ছবি মুক্তি পেয়েছে বেঙ্গল মাল্টিমিডিয়া, ইমপ্রেস টেলিফিল্ম, শাপলা মিডিয়ার ব্যানার থেকেও। তবে লাভের মুখ দেখেছে কেবল শাকিব খানের নিজের এস কে ফিল্মসের ঈদের আলোচিত-সমালোচিত ছবি পাসওয়ার্ড

এ ছাড়া কলকাতার প্রায় ডজনখানেক ছবি আমদানির মাধ্যমেও মুক্তি পেয়েছে। তবে দেরিতে মুক্তি দেওয়ায় কন্ঠ বাদে বাকিগুলো তেমন একটা সাড়া ফেলতে পারেনি। চলচ্চিত্রের এত বাজে অবস্থাতেও তারকা ও প্রযোজকদের বড়মুখ করে বহু উন্নয়নের আশাবাদ শোনা গেছে বছরজুড়েই। কারণ এ বছর অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রযোজক সমিতি ও শিল্পী সমিতির নির্বাচন। সিনেমার এমন সংকটময় দিনে লগ্নি করতে আসছেন না কোনো নতুন প্রযোজক। সিনেমার বিভিন্ন সংগঠনের সিন্ডিকেটের কারণে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন পুরনো লগ্নিকারকেরা। এসব নানামাত্রিক জটিলতার কারণেই সিনেমার ধ্বস নেমেছে বলে মনে করেন অনেকেই।

জয়া আহসানকে দেখা গেছে কলকাতার কণ্ঠ ছবিতে। দর্শকপ্রিয়তা পায়নি ছবিটি। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

মানের দিক থেকে কেমন ছিল ২০১৯ সালের ছবিগুলো
এবার আসি মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলোর ব্যাপারে। শাকিব-বুবলী অভিনীত মালেক আফসারীর পাসওয়ার্ড ছবিটির গল্প ও নির্মাণ নিয়ে নকলের অভিযোগ উঠলেও ঈদে ১৭০টিরও বেশি হল পাওয়ায় মোটামুটি লাভের মুখ দেখেছে। এ ছাড়া গোলাম সোহরাব দোদুলের প্রথম ছবি সাপলুডু আর তৌকির আহমেদের ফাগুন হাওয়ায় ভাল সাড়া ফেলেছে ও কোনমতে লগ্নির ঘরে টিকে গেছে। ব্যতিক্রম ঘরানার ছবি হিসেবে মুক্তি পেয়েছে সার্ফিং নিয়ে স্টার সিনেপ্লেক্সের প্রথম প্রয়োজনা ন ডরাই, ভ্রমণ ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপজীব্য করে নির্মিত হৃদয়ের রংধনু, তরুণ ঔপন্যাসিক সাদাত হোসাইনের মিউজিক্যাল ফিল্ম গহীনের গান, হাবিবুর রহমানের রাত্রীর যাত্রী, অসম বয়সের প্রেম বা একাকীত্ব নিয়ে অনন্য মামুনের আবার বসন্ত কিংবা চিত্রশিল্প থেকে অনুপ্রাণিত বছরের শেষ ছবি মাসুদ পথিকের মায়া: দ্য লস্ট মাদার

ন ডরাই সিনেপ্লেক্সের সকল শাখা ও বাইরের হলগুলোতে মুক্তি দিয়ে এখনো চললেও এখনো লাভের মুখ দেখেনি ছবিটি। তবে এই ছবিটির মতই আশা জাগিয়েছে বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়া অমনিবাস চলচ্চিত্র ইতি তোমারই ঢাকা কিংবা আবদুল্লাহ সাদের লাইভ ফ্রম ঢাকা। ১১ জন পরিচালকের নির্মিতি ইতি, তোমারই ঢাকা প্রশংসিত হলেও তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। ১১ নির্মাতা হলেন গোলাম কিবরিয়া ফারুকী, কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়, নুহাশ হুমায়ূন, মাহমুদুল ইসলাম, মীর মোকাররম হোসেন, রাহাত রহমান, রবিউল আলম, সালেহ সোবহান, সৈয়দ আহমেদ, তানিম নূর ও তানভীর আহসান। অস্কারে বাংলাদেশ থেকে গিয়েছে গুনী নির্মাতা নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর আলফা। ছবিটি অস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় আসতেও ব্যর্থ হয়েছে।

বড়পর্দায় অভিষেক হয়েছে ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা তাহসানের। বেঙ্গলের ব্যানারে মুস্তফা কামাল রাজের ছবি যদি একদিন-এ তাহসানের সঙ্গে পর্দা ভাগ করেছেন ওপার বাংলার শ্রাবন্তী, ছিলেন তাসকিনও। তাসকিন মূল নায়ক হিসেবেও এসেছেন শাপলা মিডিয়ার ব্যানারে বয়ফ্রেন্ড ছবিতে। যদিও দর্শকপ্রিয়তা পাননি। বাপ্পীর দাগ হৃদয়ে, পাগলামী, ডনগিরি বরাবরের মতই ফ্লপ। হতাশ করেছে দর্শকদের।

নায়ক হিসেবে শাকিব খানের ছবি এ বছর তুলনামূলক কম মুক্তি পেলেও তিনি মনোযোগী হয়েছেন প্রযোজনায়। এটি খুবই আশার খবর। জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত মনের মতো মানুষ পাইলাম না কোনোরকম সাড়া ফেলতে পারেনি দর্শকদের কাছে, ব্যবসা করতে ব্যর্থ হয়েছে। শাকিব খান ও ববি অভিনীত সাকিব সনেট পরিচালিত বিগ বাজেটের ছবি নোলক। মুক্তির আগে একমাত্র সরব ছিলেন নোলক ছবির নায়িকা ববি। তবে শাকিব খানকে প্রচারণায় দেখা যায়নি। ছবিটির কাহিনী দর্শককে কাঁদালেও তেমন একটা ব্যবসা করতে পারেনি এটি। তবে ববির আরেকটি ছবি তরুণ নায়ক রোশানের সাথে রাজা চন্দের বেপরোয়া ছবিটি পছন্দ করেছেন দর্শকেরা। জাজ মাল্টিমিডিয়ার একটি মাত্র ছবি নির্মাণের অনেক পরে মুক্তি পেলেও দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। মুক্তি পেয়েছে তরুণ পরিচালক সাইফ চন্দন পরিচালিত আব্বাস নামের ছবিটি। নিরব- সোহানা সাবা জুটিকে পর্দায় খারাপ লাগেনি।

ভাষা আন্দোলনের ‍উপর নির্মিত ছবি ফাগুন হাওয়ায়-এ তিশা ও সিয়াম আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত

৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পটভূমিকায় নির্মিত তৌকীর আহমেদ পরিচালিত ফাগুন হাওয়ায় ছবিটি দর্শকদের কাছে প্রশংসিত হলেও ব্যবসা করতে পারেনি। মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ পরিচালিত যদি একদিন ছবিটি নিয়ে দর্শকদের প্রত্যাশা থাকলেও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি খুব একটা। তবে আশাতীত সাড়া ফেলেছে গোলাম সোহরাব দোদুল পরিচালিত প্রথম ছবি সাপলুডু। আরিফিন শুভ ও বিদ্যা সিনহা মিমসহ একঝাক তারকা শিল্পীর অভিনয় ও থ্রিলার গল্প ছবিটিকে কয়েক সপ্তাহ আলোচনায় রেখেছে। ছবির পাশাপাশি আরিফিন শুভর অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন দর্শকেরা। সেন্সর জটিলতায় আটকে থাকা ফরায়েজী আন্দোলন মুক্তি পেয়েছে একেবারে বছরের শেষ দিকে। নির্মিত হয়েছে ইন্দুবালা, ভালবাসার রাজকন্যা, দি ডিরেক্টর, ভালবাসার উত্তাপ, অনুপ্রবেশ, কালোমেঘের ভেলা পদ্মার প্রেম-এর মত শিল্পসম্মত ছবি। তবে এদের কোনটিই দর্শককে হলে টানতে পারেনি। কোনটি আবার হলে মুক্তিই পায়নি আবার কোনটি ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ছবির মতো থেকে গেছে টিভি প্রিমিয়ারে।

এর বাইরে বাণিজ্যিক ও ফর্মুলা নির্ভর নির্মাণের কথা বললে কিছু ছবির নাম চলে আসে। যা শুধু বাড়িয়েছে দর্শকদের যন্ত্রণা। জেফের আই এম দ্য রাজ, আরজু পরীমনির আমার প্রেম আমার প্রিয়া, বউবাজার, জায়েদ খানের প্রতিশোধের আগুন, আকাশ মহল, ভালোবাসার জ্বালা, মাহিয়া মাহি অভিনীত অবতার, ইমন-শিলার বেগমজান, নবাগত শান্তর প্রেমচোর, মারুফের গার্মেন্টস শ্রমিক জিন্দাবাদ ছবিগুলোর কথা বলা যায়। এই ধাঁচের ছবিগুলো ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন কিছু যোগ করতে বা ব্যবসা করতে পারেনি।

পরিমনি অভিনীত আমার প্রেম আমার প্রিয়া ছবিটি দর্শক টানতে পারেনি। ছবি: পরিমনির ফেসবুক পেজ

একবাক্যে তাই ২০১৯ সালকে বাংলা চলচ্চিত্রের মন্দার বছর, বিভিন্ন ধারার ছবি তৈরির বছর আর আশা জাগানিয়া বছর বলা যায়। আশা জাগানিয়া এ কারণে বললাম, কারণ ২০২০ সালে আসতে যাওয়া চলচ্চিত্রগুলো দেখলে আন্দাজ করা যায়। কিন্তু পেছনে ফেলতে চলা এই বছরে নেই তেমন কোন অর্জন, বড় কোন চমক, নেই ধুন্ধুমার ব্যবসা করা কোন ছবি। তাই হল সংকট কাটিয়ে সিনেপ্লেক্স নির্মাণ না করলে, সরকারী জরুরী পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে আর পেশাদার প্রযোজকদের আগমন না ঘটলে অশনি সংকেত হয়েই থাকবে এই বছরটি।