লেখকের ডায়রি

সত্যজিৎ রায়ের পাঁচটি সিনেমা

শততম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি
সিনেঘর ওয়েব দল

২ মে, ২০২০
সত্যজিৎ রায়। ছবি: সত্যজিৎ রায় ফ্যানপেজ ইনস্টাগ্রাম থেকে

বাবা সুকুমার রায়ের বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন সেলুলয়েডের পাতায় অসাধারণ সব গল্প। সত্যজিৎ রায়। উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের প্রবাদ পুরুষ। শততম জন্মদিনে থাকল পাঁচটি সিনেমা নিয়ে আলাপ।

অপুত্রয়ীর প্রথম ভাগ পথের পাঁচালী
ইতালীয় চলচ্চিত্রকার ভিত্তরিও ডি সিকার বাই সাইকেল থিভস থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সিনেমায় নামেন। কিন্তু সিনেমার বীজটা বোনা হয়েছিল ফরাসি চলচ্চিত্রকার জঁ ঘনুয়াঘের সঙ্গে কাজ করার সময়। প্রথম চলচ্চিত্র পথের পাঁচালী বানিয়ে হইচই ফেলে দেন। পরবর্তীকালে এই ছবির আরও দুই কিস্তি তৈরি করেন। যা অপুত্রয়ী বা অপু ট্রিলজি হিসেবে পরিচিত।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস পথের পাঁচালী। প্রথম সিনেমার জন্য এই উপন্যাসকেই বেছে নেন সত্যজিৎ রায়। সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট। মুক্তি পাওয়ার পরে বাংলা সিনেমায় যেন শুরু হয় নতুন এক সিনেমা দেখার যুগ।

পথের পাঁচালী ছবির পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত

বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে অপু ও তার পরিবারের জীবনযাত্রাই পথের পাঁচালী সিনেমার মূল কাহিনি। অপুর বাবা হরিহর রায় নিশ্চিন্দিপুরের পৈতৃক ভিটেয় বসবাস করেন। পেশায় তিনি পুরোহিত। সামান্য আয়। লেখাপড়া জানেন কিছু কছিু। ভালো কয়েকটি যাত্রাপালা লিখে অধিক উপার্জনের স্বপ্ন তাঁর মনে। বাস্তবে তিনি বেশ ভালোমানুষ এবং লাজুক প্রকৃতির লোক। সরলতার সুযোগে সবাই সহজেই তাকে ঠকিয়ে নেয়। পরিবারের তীব্র অর্থসংকটের সময়ও তিনি তার প্রাপ্য বেতন আদায় করার জন্য নিয়োগকর্তাকে তাগাদা দিতে পারেন না। হরিহরের স্ত্রী সর্বজয়া তার দুই সন্তান দুর্গা ও অপু এবং হরিহরের দূরসম্পর্কের বিধবা পিসি ইন্দির ঠাকরুনের দেখাশোনা করেন। দারিদ্র্যের সংসার বলে নিজের সংসারে বৃদ্ধ ইন্দির ঠাকরুনের ভাগ বসানোটা ভালো চোখে দেখেন না সর্বজয়া।

সর্বজয়ার অত্যাচার অসহ্যবোধ হলে ইন্দির ঠাকরুন মাঝে মাঝে অন্য এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন। দুর্গা পড়শির বাগান থেকে ফলমূল চুরি করে আনে ও ইন্দির ঠাকরুনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে খায়। পড়শিরা এসে সর্বজয়াকে এ নিয়ে বিচার দেয়। একবার পড়শিরা এসে দুর্গাকে একটি পুঁতির মালা চুরির দায়ে অভিযুক্ত করে। একসময় ম্যালেরিয়া জ্বরে দুর্গা মারা যায়।

আদতে পথের পাঁচালীর গল্প এমন। কিন্তু কাঠামাবোদ্ধ বাণিজ্যিক সিনেমার বাইরের এই নতুন ধরনের সিনেমা দেখে অবাক উপমহাদেশীয় সিনেমা। প্রশংসা কুড়ালো বহির্বিশ্বেও। শুরু হলো সত্যজিৎ রায় নামের এক চলচ্চিত্রকারের সিনেমা যাত্রা।

পথের পাঁচালী ছবির উদাহরণীয় দৃশ্য অপু ও দুর্গার ট্রেন দেখা। ছবি: সংগৃহীত

ছবিটিতে অভিনয় করেছেন কানু বন্দ্যোপাধ্যায়, করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়, রুমকি বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। এই চলচ্চিত্রের অভিনেতারা জনপ্রিয় তারকা ছিলেন না। অন্য কলাকুশলীরাও যথেষ্ট অনভিজ্ঞ ছিলেন। তা সত্ত্বেও পথের পাঁচালী সমালোচক ও দর্শকদের প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয়। শুধু তা-ই নয়, পথের পাঁচালী স্বাধীন ভারতে নির্মিত আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনকারী প্রথম চলচ্চিত্র। ১৯৫৬ কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সিনেমাটি ‘বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট’ পুরস্কার লাভ করে। এর ফলে সত্যজিৎ রায়ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। আজকের দিনে এই সিনেমাটিকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে একটি মনে করা হয়। এটি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট ফিচার ফিল্ম ও ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট ফিচার ফিল্ম বাংলাসহ ১৭টি দেশের আন্তর্জাতিক পুরস্কার পায়।

অপুত্রয়ীর দ্বিতীয় ভাগ অপরাজিত

১৯৫৫ সালে মুক্তি পায় পথের পাঁচালী। তখনো সত্যজিৎ রায়ের মাথায় ছিল না এই ছবির সিক্যুয়েল বানানোর কোনো পরিকল্পনা। কিন্তু পথের পাঁচালী ব্যাপাক জনপ্রিয়তা ফেলে অপু চরিত্রটির প্রেমে পড়ে যান সত্যজিৎ। চরিত্রটি নিয়ে আরও কাজ করার বিষয়টি মাথায় আসে। সেই চিন্তা থেকেই জন্ম অপরাজিত সিনেমার।

ছবির গল্পে দেখা যায়, অপুর বাবা হরিহরের আয় কাশীতে গঙ্গার ঘাটে বেদপাঠ করে। এখানে স্কুল নেই। তাই অপু এখন মুক্ত স্বাধীন। টইটই করে ঘুরে বেড়ানেই তার কাজ। এর মধ্যে একদিন হরিহর ঘরে ফিরেই অসুস্থ হয়ে যান। পরেরদিন সকালে সর্বজায়ার নিষেধ সত্ত্বেও ঘাটে যাযন হরিহর, সেখান থেকে ফেরার পথে ফের অসুস্থ হয়ে যান। এবং ভোরবেলা মারা যান হরিহর।

অপরাজিত ছবির পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত

সর্বজায়া একটা বাড়িতে রান্নার কাজ নেয়, সেখানে অপুকে দেখা যায় কর্তার মাথা থেকে পাকা চুল বেছে দিতে যার বিনিময়ে সে দু পয়সা পায়। অপুর ভবিষ্যতের কথা ভেবে সর্বজায়া রান্নার কাজ ছেড়ে তার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের গ্রামে গিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়।

পরেরদিন থেকে অপুর পুরোহিত হবার পাঠ শুরু হয় কিন্তু সেখান থেকে ফেরার পথে গ্রামের ছেলেদের স্কুলে যেতে দেখে বাড়িতে জিনিসপত্র রেখে সে ছুটে যায় স্কুলের দিকে। রাতের বেলা মুখ ভার করে শুয়ে থাকলে সর্বজায়া তাকে জিজ্ঞেস করে কী হয়েছে। তারই উত্তরে অপু জানায় স্কুলে পড়তে চাওয়ার কথা। পুরোহিত হবার পাঠের পাশাপাশি চলতে থাকে অপুর স্কুলে যাওয়া। অপু জেলাতে সেকেন্ড হওয়ায় কোলকাতাতে কলেজে পড়তে যেতে চায় এই কথা সর্বজায়াকে জানানোর পর মা ছেলের মাঝে দেখা যায় মানসিক টানাপড়েন। অপু অবাধ্য হলে রাগের মাথায় সর্বজায়া অপুকে চড় মারেন, যার কারণে সে রাগ করে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সাথেই সর্বজায়া অনুতপ্ত হয়ে ছেলেকে খুঁজে বুঝিয়ে ঘরে নিয়ে আসেন এবং কোলকাতা যাবার অনুমতি এবং শুরুর খরচ দিতে রাজি হন। সেটা শুনে অপু অনেক বেশি খুশি।

কোলকাতাতে ছাপাখানায় কাজ করে, পড়াশোনা করে মায়ের জন্যই যেন গ্রামে ফিরে আসে, যেখানে তার মন টেকে না একেবারে। এদিকে সর্বজয়া ছেলের পড়ালেখার ক্ষতি হবে ভেবে নিজের অসুস্থতার কথা জানায় না। যখন অপু জানতে পারে, তখন ফিরে এসে আর সর্বজয়াকে পায় না।

অপরাজিত সিনেমাতে অপুর বাবা হরিহরের মৃত্যুর দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

অপরাজিত চলচ্চিত্রটি পথের পাঁচালীর মতো এত নামডাক পায়নি। তবে দেশের বাইরে বেশ প্রশংসিত হয় সিনেমাটি। বাংলার আরেক দুই পুরোধা চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন আর হৃত্বিক ঘটকের মতে, সত্যজিতের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র অপরাজিত সিনেমাটি। ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে, ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে দুই দুইটি পুরস্কার পেয়েছে, সেই সাথে নিউ ইয়র্কে প্রায় আট সপ্তাহ ধরে প্রদর্শনী চলেছে।

অপুত্রয়ীর তৃতীয় ভাগ অপুর সংসার

অপুত্রয়ীর শেষে সিনেমা অপুর সংসার। এখানে পরিচালক অপুর সংসারি জীবনকে তুলে ধরেছেন। সেই সঙ্গে দেখিয়েছেন সেই সময়ের ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা।

অপু আইএ পাস করেছে বটে, কিন্তু চাকরি এখনো জোটাতে পারেনি। চাকরির সন্ধানে কলকাতায় ভাড়া বাড়িতে থেকে টিউশন করে পেট চালায়। নিশ্চিন্দিপুরের সেই সরল গ্রাম্য বালক এখন পুরোপুরি কলকাতার নাগরিক। বাড়িওয়ালার সঙ্গে বাড়িভাড়া নিয়ে অপুর ঝগড়া বাধে। বাড়িওয়ালা ভাড়া না পেয়ে তাকে বিদায় করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে চলে যাওয়ার সময় ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে গেলে অপু ওই বাতিসহ বাইরেরটাও জ্বালিয়ে দেয়। তারপর আবার নির্বিকারভাবে দাড়ি কামানোয় মন দেয়।

অপুর সংসার ছবির পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত

এরই মধ্যে বেকার যুবক অপুর হঠাৎ করেই এক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা। তো একদিন বন্ধুর সঙ্গে খুলনায় ঘুরতে আসে। উদ্দেশ্য বন্ধুর মামাতো বোনের বিয়েতে অংশ নেওয়া। কিন্তু বর পাগল হওয়ায় বাড়ির সবার অনুরোধে অপু বন্ধুর ওই মামাতো বোন অপর্ণাকে বিয়ে করে কলকাতায় চলে আসে।

শুরু হয় অপুর সংসার। অপর্ণা দারিদ্র্য স্বামীর ভাড়া বাড়ির সংসারে মানিয়ে নেয়। স্বামী অফিস থেকে ফিরলে তার সঙ্গে মশকরা করে। নানা খুনসুটিতে কাট অপু ও অপর্ণার সংসার। দৈবাত এক দুর্ঘটনায় ঘটে যাওয়া বিয়েটা যেন অপুর জন্য স্বর্গের দ্বার খুলে দেয়। এদিকে বন্ধুর দেওয়া টাইপরাইটারের চাকরি এবং টিউশনি নিয়ে চলে অপুর ছোট্ট সংসার। ধীরে ধীরে অপুর সংসারে যুক্ত হয় নতুন মানুষ। অপর্ণা গর্ভধারণ করে। কিন্তু সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু হয় অপর্ণার। প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে বিপর্যস্ত অপু আত্মহত্যার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। অপু আবার ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে। ভেঙে যায় সোনার সংসার।

অপুর সংসার ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও শর্মিলা ঠাকুর। ছবি: সংগৃহীত

এদিকে চাকরদের কাছে মানুষ হওয়ার ফলে অপুর মা-হারা ছেলে কাজল মারাত্মক দুরন্ত। তার কাছে কলকাতা এবং বাবা এই দুটো কথা প্রায় সমার্থক। কারণ তাকে বলা হয়েছে, তার বাবা কলকাতায় থাকে এবং দুটোই তার কাছে অদেখা। অপু বাবা হিসেবে কাজলকে ধরতে গেলে কাজল ঢিল ছুড়ে তার মাথা ফাটিয়ে দেয়। কিন্তু সে যখন বলে সে কাজলের বন্ধু এবং তাকে কলকাতায় নিয়ে যেতে চায়, তখন কাজল রাজি হয়। এভাবে জৈবিক সম্পর্কের সীমানা ছাড়িয়ে মানবিক ও সামাজিক সম্পর্ক ধরা দেয় গুরুত্বপূর্ণভাবে। অপুর কাঁধে চেপে কাজল চলে কলকাতায়।

এই ছবিতে প্রথমবারের মতো সত্যজিত নিয়ে আসেন এক তারকা জুটি। সৌমিত্র চ্যাটার্জি এবং শর্মিলা ঠাকুর এই সিনেমায় অভিনয় করেন। ১৯৫৯ সালে সিনেমাটি মুক্তি পায়। অপুর সংসার ১৯৫৯ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। ১৯৬০ সালে পায় ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট পুরস্কার।

গুপী গাইন বাঘা বাইন

যদিও ছবিটিকে ছোটদের জন্য নির্মাণ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়, এমন কথা শোনা যায়। তবে ছবিটি সব বয়সীদের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। শুধু তাই নয়, এই ছবিকে বাংলা ছবির মিউজিক্যাল ঘরানার বললেও মিথ্যা বলা হবে না। তা ছাড়া এই ছবির হাত ধরেই নির্মিত হয়েছিল বাংলা সিনেমার অন্যতম রাজনৈতিক ছবি হীরক রাজার দেশে

গুপি গাইন বাঘা বাইন ছবির পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত

গুপী চরিত্রের তপেন চট্টোপাধ্যায় আর বাঘা চরিত্রের রবি ঘোষ আজও বাঙালির মনে অসাধারণ দুটি চরিত্র। আমলকী গ্রামের সাদাসিধে ছেলে গুপীনাথ। গান গাইতে খুব ভালোবাসে। এক দিন রাজাকে খুশি করতে রাজার বাড়ি গান শোনাতে যায় সে। কিন্তু হায়! রাজা তো একেবারেই গান শুনতে ভালোবাসেন না। গান শুনে খুশি হওয়ার বদলে রাজা রেগে গিয়ে গুপীকে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এদিকে হরীতকী গ্রামের ছেলে বাঘানাথেরও কপাল মন্দ। তার আবার ঢোলবাজানোর শখ। কিন্তু বাঘার বাদন শুনে বিরক্ত হয়ে তাকেও গ্রাম থেকে বের করে দেয় গ্রামবাসী। গ্রামের বাইরে এক গহিন বনে দেখা হয় দুই হতভাগ্যের। রাতের বেলা হঠাৎ তাদের সঙ্গে দেখা হয় ভূতের রাজার। ভূতের রাজা গুপী-বাঘার গান শুনে খুশি হয়ে উপহারস্বরূপ তিনটি বর দেন।

এরপর দুই বন্ধু মিলে হাঁটতে শুরু করে এক অজানার উদ্দেশ্যে। হাঁটতে হাঁটতে শুন্ডী নামক এক রাজ্যে গিয়ে উপস্থিত হয় তারা। সে সময় চলছিল গানের প্রতিযোগিতা। দেরি না করে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় দুজনে। গীতবাদনে তারা জয় করে শুন্ডী রাজার মন। রাজাও মনস্থির করে ফেলেন নিজের মেয়ের সঙ্গে তাদের বিয়ে দেবেন।

গুপি গাইন বাঘা বাইন ছবির দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু দুভার্গ্য আর যায় না দুই হতভাগ্যর কাপাল থেকে। হঠাৎই দূরের রাজ্য হাল্লা থেকে আসে যুদ্ধের ফরমান। আতঙ্কিত হয়ে পড়েন রাজা। গুপী-বাঘা আতঙ্কিত রাজাকে আশস্ত করে বলেন, এ সংকট তারাই সমাধান করবেন। রহস্য উদ্ঘাটনে গুপী ও বাঘা হাল্লায় গিয়ে দেখে এসব চক্রান্তের পেছনে রয়েছেন কুচক্রী মন্ত্রী। তিনিই রাজাকে সম্মোহিত করে প্রলুব্ধ করে যুদ্ধের আদেশ দিয়েছেন। গুপী-বাঘা তাদের ভূতের দেওয়া তিনবর আর বুদ্ধির বলে বানচাল করে দেয় কুচক্রী মন্ত্রীর পরিকল্পনা। এরপর যথারীতি রাজ্যে শান্তি ফিরে এল। রাজার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাজকন্যাদের সঙ্গে বিয়ে হয় গুপী আর বাঘার।

হীরক রাজার দেশে

গুপী গাইন বাঘা বাইন মুক্তি পাওয়ার ১১ বছর পর হীরক রাজার দেশে নামে এর সিক্যুয়াল তৈরি করেন। হীরক রাজার দেশে ছবিতে রূপকের আশ্রয়ে তিনি ভারতীয় রাজনৈতিক বাতাবরনের ছবি আঁকেন। এই ছবিটিকেও মিউজিক্যাল বললে ভুল হয় না। তবে এই ছবি ঠিক মিউজিক্যালের মতো গান নয় কবিতার একটা অসাধারণ দিক রয়েছে।

হীরক রাজার দেশে ছবির পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত

এই ছবির মাধ্যমে ভারতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক চরিত্রগুলোর চিত্র এঁকেছিলেন সত্যজিৎ রায়। এক রাজদরবার কী করে চাটুকারে পরিণত হয়। এবং ব্যতিক্রমী চিন্তা সম্পন্ন লোকগুলোকে কী করে মগজধোলাই করা হয় তার অসামান্য উদাহরণ হীরক রাজার দেশে।

হীরক রাজার দেশে ছবির দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

শুধু তাই নয়, একটা একনায়কতন্ত্রী সরকার কীভাবে নাগরীকদের পিষে মারে তার বড় উদাহরণ এই ছবি। এই ছবির বেশ কিছু গান তখন মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল -কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়/ও ভাইরে ও ভাই/কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়...।

তথ্যসূত্র:
১. সত্যজিতের পাঁচ সিনেমা, নিলুফার ইয়াসমিন, দেশ রূপান্তর
২. সত্যজিতের অপরাজিত: মা ছেলের সম্পর্কের অনন্য আখ্যান, ফাতেমা নুজহাত কাদেরী, রোর বাংলা
৩. বিজ্ঞাপনের কাজ থেকে প্রচ্ছদ শিল্পী, নিঃস্ব হতে বসেছিলেন পথের পাঁচালির জন্য, আনন্দবাজার