লেখকের ডায়রি

যে কাহিনিতে চোখ ভিজে যায়

সিনেঘর ওয়েব দল

১২ মে, ২০২০
ইরফান খান। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

রূপালি পর্দায় ঝলক দেখিয়ে অনেকেই নায়ক হয়েছেন। কিন্তু বাস্তব জীবনের নায়ক কজন। সদ্য প্রয়াত বলিউড অভিনেতা ইরফান খান যে বাস্তব জীবনেরও নায়ক। ভারতের মাহরাষ্ট্রের নাসিক জেলার ছোট্ট ইগতপুরী গ্রামের আদিবাসী মানুষের কাছে যে তিনি সত্যিকারের নায়ক। না, তাঁর ছবি দেখে তাঁরা তাঁকে ভালোবাসেননি, ভালোবেসেছেন তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বলে।

সম্প্রতি সেই গ্রামের মানুষের ইরফান খানের প্রতি ভালোবাসার খবর প্রকাশ করে ভারতীয় গণমাধ্যম আনন্দবাজার। ওই পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরফান খানের ইচ্ছা ছিল একটি ফার্মহাউজ দেবেন। তাঁর জন্য জায়গা খুঁজে নিলেন। কিন্তু যে জায়গায় তিনি ফার্মহাউজ দেবেন, সে গ্রামের মানুষের অস্বচ্ছলতা দেখে খারাপ লাগে ইরফানের। তাদের জন্য কাজ করেন। এর মাধ্যমেই ইরফান বাস্তবের হিরো হিসেবে দেখা দেন সেই আদিবাসী গ্রামের কাছে।


মহারাষ্ট্রের নাসিক জেলায় আছে ছোট্ট একটি গ্রাম। নাম ইগতপুরী। এই গ্রামের দুই পাশে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা দিয়ে জড়ানো। একটু এগোলেই ত্রিঙ্গালওয়াড়ি দুর্গ। একটি আদিবাসী গ্রাম। এখানে কোনো সিনেমা হল নেই। দারিদ্র্য ক্লিষ্টে ভরা এই গ্রামে সবার বাড়িতে টিভি আছে এমনটিও নয়। তবু ইরফানের একটি ছবিও তাদের বাদ দেওয়া চলবে না। ৩০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে সেই গ্রামের মানুষ নাসিকে আসতেন শুধুমাত্র ইরফানের সিনেমা দেখবেন বলে। কেন? কারণ এই মানুষগুলোর সঙ্গে ইরফানের খানের আত্মীয়তা জড়িয়ে আছে। তিনি যে তাদের বাস্তব জীবনের নায়ক।

কীভাবে এই সম্পর্ক দাঁড়িয়ে গেল? সে এক আলাদা কাহিনি। যাঁরা ইরফানের অভিনয়ের ভক্ত, রূপালি পর্দার ইরফানকেই হয়তো ভালো লাগে। কিন্তু বাস্তব জীবনেও যে এক নায়ক বাস করেন ইরফান খান নামে তার খবর তাদের কাছে হয়তো নেই। চলুন জেনে আসা যাক সে গল্প।

নাসিক জেলার ইগতপুরীর ওই মনোরম পরিবেশে ইরফান খানের ইচ্ছে জাগে একটি খামারবাড়ি গড়বেন। জায়গা-জমিও কেনা শেষ। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁর চোখের সামনে ভাসে এক রূঢ় বাস্তবতা। খামারবাড়ি করার ইচ্ছা চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো উবে যায় ইরফানের মন থেকে। ইরফান দেখেন, সেখানের ত্রিঙ্গালওয়াড়ি, পারদেবী, কুশগ্রাম ইত্যাদি অঞ্চলে স্কুল রয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাতে উপযুক্ত পরিষেবা নেই। স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে, কিন্তু তাতে কোনো দিন অ্যাম্বুল্যান্সের আওয়াজ শোনা যায়নি। স্থানীয় নেতা গোরাখ বোড়কের কাছে রাস্তার পাশের এক ধাবায় বসে রুটি-সব্জি খেতে খেতে কথাগুলো শুনেছিলেন ইরফান।


এবার ইরফান এলেন দেবদূত হয়ে। সবার অলক্ষ্যে তিনি নিঃশব্দে গ্রামে পাঠালেন অ্যাম্বুল্যান্স। দিলেন বইখাতা, রেইনকোট, সোয়েটার কেনার টাকা। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পাঠাতেন মিষ্টি। মুম্বাইয়ে ঝকঝকে শহর থাকবে, অথচ তার পাশেই থাকবে এমন দৃশ্য কল্পনা করতে পারলেন না ইরফান। পাঠালেন কম্পিউটার। প্রতি বছর দিয়ে যেতেন এগুলো। ওই গ্রামে গেলে সবার সঙ্গে বসে রুটি-সব্জি খেতেন। এমন মানুষ রূপালি পর্দা থেকে নেমে এসে বাস্তবের হিরো হয়েছেন। তাই ইগতপুরের মানুষরে কাছে হয়ে গেলেন তিনি বাস্তবেরই হিরো।

তাই আর কাউকে হয়তো তাঁরা চেনেন না। তাদের ছবিও তাদের দেখার অত গরজ নেই। কিন্তু ইরফান খানের ছবি মুক্তি পাওয়া মানে, নাসিক জেলায় ইগতপুরের বাসিন্দারা হাজির। এ ছবি দেখার লোভ নয়, প্রিয় হিরোর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এক তরিকা যেন। সেই মানুষগুলোর কাছে যখন ইরফানের অসুস্থতার খবর যায়, গ্রামজুড়ে নেমে এসেছিল নিস্তদ্ধতা। হিরোর জন্য প্রার্থনা করেছিল গোটা গ্রাম। অনেক দিন ইরফানের ছবি না দেখতে পারায় মন উশখুশ করছিল তাঁদের। ইরফান সুস্থ আছে তো? অবশেষে ‘আংরেজি মিডিয়াম’ মুক্তি পেতেই স্বস্তির শ্বাস ফেলেছিলেন তাঁরা।


কিন্তু আচমকাই ইরফানের মৃত্যুসংবাদে কান্নায় ভেয়ে পড়ে পুরো গ্রাম। ইরফান নেই এ কথা তাদের বিশ্বাসের ওপারে। কীভাবে মানবেন এই আদিবাসী গ্রামের মানুষেরা। তাদের নায়ক মরে যেতে পারেন, এ বিশ্বাস তাঁরা করতে চান না। ইরফানের মৃত্যুতে কেঁদেছিল বলিউড। ডুকরে উঠেছিলেন নেটিজেনরা। কিন্তু নাসিকের নাম না জানা গ্রামের আদিবাসীরা অভিভাবক হারানোর শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন।

কিন্তু সত্যকে মেনে নিতে হয়। বাস্তবতাকে মেনে নিতে হয়। তাই তারা শোক কাটিয়ে ওঠেন। সামাজিকযোগাযোগমাধ্যমের স্ক্রলে হয়তো ইরফানের ছবি দ্রুতই কমে আসা শুরু করছে। কিন্তু যাদের জীবনের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন ইরফান খান। তাঁরা কী করে ভোলেন তাঁকে। তাই তো ইরফানের খামারবাড়ি ছিল যে জায়গায় সেই জায়গারই নাম বদলে দিলেন প্রিয় নায়কের জন্য। সেই জায়গার নাম দিলেন ‘হিরো চি ওয়াড়ি’। শব্দটি মরাঠি। বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘হিরোর পাড়া’।