লেখকের ডায়রি

কোন পথে ঢালিউড

চলচ্চিত্র
মারুফ হাসান ইমন

১৪ আগস্ট, ২০২০

সংকট মূলত কোথায়
দেশের সিনেমা যে নতুন করে সংকটে পড়েছে তা নয়। তবে এবারের সংকটটা যুগ বদলের পালায় নিজেদের পিছিয়ে পড়ার সংকট। একদিকে করোনায় সিনেমা হল বন্ধ, নতুন সিনেমার কাজ বন্ধ, প্রযোজনায় আসছে না নতুন কেউ। আর অন্যদিকে চলচ্চিত্র সংগঠনগুলোর নিজেদের মধ্যে রেষারেষিতে হুমকির মুখে পড়ছে সিনেমার সামনের দিনগুলো।

কয়কেদিন আগে আন্তর্জাতিকভাবে নন্দিত নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর একটি সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম। তাকে বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই অনীহা প্রকাশ করলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য এমন, এটা এমন একটি প্রসঙ্গ যা নিয়ে সত্যিকার অর্থে কারো কোনো মাথাব্যাথা নেই। সত্যিই ঢালিউড নিয়ে কোন কথা শুনলেই বুকভরা দীর্ঘশ্বাস বাদে আর কিছু পাওয়া যায় না এখন।

কালের কণ্ঠ পত্রিকা লিখছে, এখন সিনেমার প্রিণ্ট কিনে নিয়ে পূর্ণরূপে চালানোর মতো হল আছে মোটে ৬৫ টি। এর চেয়েও খারাপ খবর হলো, সিনেমার পাইপলাইন বলে যে ব্যাপারটা কাজ করে সেখানে বছরখানেক পরেই আর ছবির যোগান নেই। মানে দাঁড়াচ্ছে, হল এবং সিনেমা দুই সংকটের সামনেই এখন সাধের ঢালিউড।

কোনো একটা দেশের সিনেমাকে ‘শিল্প’ বলার জন্য যেসব উপাদান লাগে, বর্তমানে আমাদের দেশে সেগুলো কতটা বিরাজমান তা নিয়েও আছে অনেক প্রশ্ন। গার্মেন্টস শিল্প যেমন করোনা আসার কারণে তাদের সক্ষমতা কতটা আছে তার জানান দিয়েছে, সিনেমার এই ক্ষুদ্র বাজারও আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আমরা কতটা রিক্ত।

বলিউড, হলিউডসহ ভারতের অন্যান্য রাজ্য তাদের ইন্ডাস্ট্রির ঝুলিতে থাকা সিনেমাগুলোকে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি দিচ্ছে। নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, জি ফাইভ, ডিজনি প্লাস হটস্টার, অল্ট বালাজি, সনি লিভ কিংবা অঞ্চলভেদে সান নেক্সট বা হইচই, আড্ডটাইমস এ সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ মুক্তি দেয়া এই লকডাউন পরিস্থিতিতে দর্শকদের আরো বেশি পরিচিত করছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে, তেমনি চালু থাকছে সিনেমা মুক্তিও।

বড় বাজেটের সিনেমাগুলো সেখানে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হলে মুক্তির জন্য অপেক্ষা করলেও মাঝারি বা ছোট বাজেটের সিনেমা ও সিরিজগুলো বেশ ফলাও করে প্রচারণা করে আনা হচ্ছে দর্শকদের সামনে।

করোনায় আটকে আছে পরীমনি অভিনীত বিশ্বসুন্দরী সিনেমাটি। ছবি: ফেসবুক থেকে

একটু আমাদের দিকে চোখ ফেরালে মনে হয়, এখনো আমরা সেই গত দশকের চোরাবালিতে আটকে আছি। বায়োস্কোপ, বিঞ্জ, আইফ্লিক্স বা বঙ্গের মত কিছু ওয়েব স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম থাকলেও সেখানে নেই কোনো নতুন সিনেমার মুক্তি বা দর্শকের কাছে নেই প্ল্যাটফর্মগুলোর যথাযথ পৌঁছানোর কৌশল। গুটিকয়েক পুরনো ও মানহীন কাজের অস্তিত্ব চোখে পড়লেও সেগুলো আসলে সিনেমার সামনের দিনকে কোনো আলো দেখাতে পারছে না। বরং আমাদের দেশের দারুণ, জনপ্রিয় ও পুরস্কারপ্রাপ্ত কিছু সিনেমা হাত ফস্কে চলে যাচ্ছে হইচই-এর মতো ভারতীয় বাংলা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে।

ফলে নিজের ভাজা মুড়ি দিয়ে পাশের দেশে বানানো মোয়া খেতে হচ্ছে আমাদের দর্শকদের।

স্বপ্নজাল, অনিল বাগচীর একদিন, পিপড়াবিদ্যা কিংবা টেলিভিশনের মত দারুণ সিনেমাগুলো টাকা খসিয়ে আমরা দেখতে বাধ্য হচ্ছি হইচই থেকে। বিঞ্জের মত এন্ড্রয়েড প্ল্যাটফর্ম তাদের ওয়েব সিরিজ দিয়ে সাড়া ফেললেও অশ্লীলতা বিতর্কে চাপের মুখে আছে। এই বিতর্ক থেকে যে নীতিমালায় তাদের আনার কথা তারও কোন অগ্রসরতা দেখা যাচ্ছে না। ফলে সময় পাল্টে গেলেও আমাদের সিনেমা এখনো স্বাবলম্বী হতেই বেশি সময় নিয়ে নিচ্ছে।

আমরা কী করছি
আমাদের দেশের চলচ্চিত্র নিয়ে মাথাব্যাথা থাকার কথা সংশ্লিষ্ট তথ্য মন্ত্রণালয়, প্রয়োজনা প্রতিষ্ঠান ও জ্যেষ্ঠ ও বর্তমান অভিনয়শিল্পীদের। ঢালিউডে এই তিন গোষ্ঠীর কারো মাঝে কোনো সমন্বয় নেই, জবাবদিহিতা নেই, ভবিষ্যত পরিকল্পনা বা সংকট থেকে উত্তরণের কোনো উদ্যোগ নেই। সরকারীভাবে ৬৪টি জেলায় ডিজিটাল প্রেক্ষাগৃহ চালুর কথা বলা হলেও সেসব প্রকল্প কবে আলোর মুখ দেখবে জানা নেই।

এই লকডাউনের প্রেক্ষাপটে যেসব হল মালিকেরা হল বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা কীভাবে চলবেন তা নিয়ে কোনো কথা হয়নি। ফলে মূল্যবান জায়গা নষ্ট করে মালিকেরা হল চালু রাখতে চাইবেন না আর। ফলে করোনা চলে গেলেও আমরা আগের সংখ্যার সমান হল আর ফেরত পাবো না এটি নিশ্চিত। অন্যদিকে যেসব প্রযোজক লগ্নি করবেন তাদেরও চিন্তা আছে। তাঁরা ছবি মুক্তি দেবেন কোথায়? কারণ, দেড় থেকে দুশো হলের কথা ভেবে বাজেট ঠিক রেখে সিনেমা বানালেও যদি হলের সংখ্যা এই করোনার পর একশোর নিচে নেমে আসে, তখন প্রযোজক করবেন কী, এটাও এখন প্রশ্ন।

সংগঠনকে গুরুত্ব নয়, বেশি বেশি সিনেমা বানানোই হওয়া উচিত প্রধাণ লক্ষ্য।

মরার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে এসেছে, চলচ্চিত্র সংগঠনগুলোর দলাদলি আর রেষারেষি। নিজেদের স্বার্থ হাসিলকে অর্জন করতেই তারা ব্যস্ত। সিনেমা নির্মাণের চাইতে তাদরে কাছে সংগঠনই অনকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা ছাড়া বিভিন্ন সময় সংগঠনগুলো তাদের নির্বাচনকে সামনে রেখে যেভাবে পরস্পর কাদা ছোঁড়াছুড়ি শুরু করে তা লজ্জাজনক। যে দেশে একশোর ওপর হল না থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, সেখানে চলচ্চিত্রের সংগঠন নাকি বিশেরও বেশি। যাদের সাংগঠনিক লক্ষ্য ছিল শিল্পী, কলাকুশলী, পরিচালক, প্রযোজক, প্রদর্শকদের উন্নয়ন তারা সবাই মিলে এখন কোমড় বেধে কোন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন তা-এখন অজানা।

এই ২০২০ সালে এসেও সেন্সর বোর্ড একটা যুজুর ভয়। কোনো গ্রেডিং পদ্ধতি নেই, ই-টিকেটিংয়ের ব্যবস্থা নেই, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও টিভি রাইটের সঠিক নীতিমালা ব্যবস্থাপনা নেই, বক্স অফিস বলে কিছু নেই, সিনেমা ডিস্ট্রিবিউশনে কোনো নিরীক্ষা বা যথাযথ পদ্ধতি নেই, কোনো ভাল ফিল্ম সিটি বা সিনে পার্ক নেই, হলের সংখ্যা দিনদিন কমছে, সিনেপ্লেক্সের সংখ্যা একেবারে হাতেগোনা, সবকিছু মিলে বিরাট গলদ হয়ে আছে পুরো সিস্টেমে। তাই দেশীয় সিনেমার ভবিষ্যত শুধু অন্ধকার নয়, বিলুপ্ত হবারও কাছে যেতে বেশি সময় বাকি নেই আর।

যা করতে পারা যায়
রাতারাতি চাইলেই পুরো দৃশ্যপট পাল্টে ফেলা যাবে না। আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির বিরোধী কিছু চালানো যেমন আমাদের কাম্য নয় তেমনি হল বাচাতে যুতসই অন্য কোনো ব্যবস্থা চালু রাখলে ভাল। যেটা না করায় কেউ কেউ খুশি হলেও মরতে বসেছে হলমালিকেরা। তারা চান সিনেমার পাইপলাইন চালু থাকুক। একটি সিনেমাহলে সব খরচ মাথায় রেখে বছরে কম করে হলেও ৪০টির মতো সিনেমা মুক্তি দিতে হবে, যেখানে উৎসব পার্বণ মিলিয়ে ব্যবসাসফল হতে হবে পনেরটির বেশি সিনেমা।

পরাণ ছবি নিয়ে প্রস্তুত মিম। হল খোলার অপেক্ষা। ছবি: ফেসবুক

আর যৌথ প্রযোজনা নীতিমালার পর সিনেমা মুক্তি কমে দাঁড়িয়েছে ২৫ থেকে ৩০টিতে। ব্যবসাসফল হচ্ছে মোটে চার থেকে পাচটি ছবি। একদিকে যৌথ প্রযোজনার কঠোর নীতিমালা অন্যদিকে দেশীয় প্রযোজকদের ক্ষতির আশংকায় সিনেমায় লগ্নি না করাতে ধীরে ধীরে এই সংখ্যা আরো কমে যাচ্ছে।

করোনা চলে গেলেও যে মহা ক্ষতি হয়ে গেল হলমালিকদের তা পুষিয়ে ওঠা খুব কঠিন। বিশেষ করে সরকারী প্রণোদনা বা সাহায্য না দিলে অনেক হলেই আর ছবি চলবে না। ফলে হলমালিক ও প্রদর্শকদের কথা এখনই বিবেচনায় আনা জরুরী হয়ে পড়েছে।

এরপর যে বিষয়টি খুব জরুরী তা হচ্ছে একটি সুনির্দিষ্ট ও ব্যালান্সড যৌথ প্রয়োজনার নীতিমালা যেখানে দেশীয় সংস্কৃতির সাথে সাথে ব্যবসা ও সিনেমার বাজারের একটি সমানাধিকার নিশ্চিত হবে। এমনও শোনা গিয়েছিলো, কোন কোন সিনিয়র শিল্পী নিজেই সিনেমা প্রযোজনায় নেমে বছরের দশ বিশটি সিনেমা নির্মাণ করে যৌথ প্রযোজনার অভাব ঘুচিয়ে দেবেন। বাস্তবে দেখা গেল উল্টো। নতুন প্রোডাকশন হাউজ বাড়ার বদলে আগেরগুলোও কমতে শুরু করলো। আর সিনেমার বাজারের কথা ভেবে লগ্নি করতে সাহস পেলেন মোট দু একজন তারকা কাম প্রযোজক যা যথেষ্ট নয়।

প্রযোজকের লগ্নিকৃত টাকা ফেরত আসার নিরাপদ কিছু পথ আছে। এর মাঝে টিভি রাইট, ডিজিটাল রাইট, গান আলাদাভাবে বিক্রি ও বিভিন্ন স্পন্সর কাজে লাগানো অন্যতম উপায়। তবে এগুলো সঠিকভাবে করা যেতে পারে সিনেমা নামক পণ্যটির মান, প্রচার, সঠিক বিপণণ, বক্স অফিস ও ইটিকেটের ব্যবস্থা করলে। সর্বোপরি সরকারী দ্রুত হস্তক্ষেপ এখানে খুব প্রয়োজন।

আরেকটি বিষয় না বললেই নয়। আমাদের চলচ্চিত্রের মঙ্গলের জন্য গঠিত হওয়া যেসকল সংগঠন আদতে অমঙ্গল বয়ে নিয়ে এসে বিব্রত করছে তাদের ছেটে ফেলা জরুরী। সিনেমার জন্য সংগঠন, সংগঠনের জন্য সিনেমা নয়। যেখানে সিনেমা হুমকির মুখে, বিলুপ্তির পথে হল সেখানে এত সংগঠন থেকে কি লাভ আসলে।

অগ্নি সিনেমার মতো আরও বেশ কিছু ভালো সিনেমা দর্শক চায় নায়িকা মাহিয়া মাহির কাছে।

নতুন প্রযোজকদের চলচ্চিত্রে আসার পথ সুগম করতে হবে। মাল্টিপ্লেক্স চালুর কাজ খুব তাড়াতাড়ি একটা ব্যবসায়িক লাভজনক জায়গায় আনতে না পারলে মান্ধাতা আমলের হল দিয়ে দর্শক টানা যাবে না। নারী ও শিশুদের কথা মাথায় রেখে প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ তৈরি করলে কাজটা সহজ হয়ে যাবে।

সবশেষে আবার একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। যেই সিনেমার উন্নয়ন নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথাই নেই তা নিয়ে বলে লাভ কি। তাই বলার পাশাপাশি সাধারণ দর্শক শুধু আশাই করে রাখতে পারেন। নয়তো খুব দেরি নেই, আমাদের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় পার করে আসা সিনেমা গভীর অমানিশায় হারিয়ে যাবে।