চলচ্চিত্র সমালোচনা
এশিয়া   বাংলাদেশ   হাঙর নদী গ্রেনেড

 

চলচ্চিত্র: হাঙর নদী গ্রেনেড
পরিচালক: চাষী নজরুল ইসলাম
কলাকুশলী: সুচরিতা, সোহেল রানা, অরুনা বিশ্বাস
সাল: ১৯৯৭
দেশ: বাংলাদেশ
রেটিং: ৪/৫

 

আত্মত্যাগের সুন্দর একটি গল্প

  সিনেঘর ওয়েব দল

১ জুন, ২০১৯

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর ভিত্তি করে প্রচুর চলচ্চিত্র রয়েছে। কিন্তু আমার কাছে এই চলচ্চিত্রটি ভাল লাগার একটি বিশেষ কারণ হল এখানে একজন মায়ের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস আত্মত্যাগের সুন্দর একটি গল্প ফুটে উঠেছে। সেই সঙ্গে তখনকার গ্রাম বাংলার সুন্দর প্রেক্ষাপট খুবই সুন্দর করে উপস্থাপন করেছেন চলচ্চিত্রটির পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম। আর এই চলচ্চিত্রটি সেলিনা হোসেনের একই নামের উপন্যাস থেকে তৈরী, যে উপন্যাসটিতেও গল্পটি অনেক সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, এবং যা অনেক জনপ্রিয়।

দুরন্ত এক কিশোরী বুড়ির বেড়ে ওঠা, তার দুষ্টুমি, যৌবন বয়সেও তার ছেলেমানুষি দিয়ে মূলত চলচ্চিত্রটি শুরু হয়। অল্প বয়সে বিয়ে হয় তার থেকে দ্বিগুণ বয়স্ক গফুরের সাথে। গফুরের আগের ঘরের দুই সন্তান, সলিম আর কলিম। দুজনকেই বুড়ি ভালোবাসে। তাও সে তার নিজের সন্তান চায়। জন্ম হয় তার নিজের সন্তান রইসের। কিন্তু অনেক সাধনার সন্তান রইস হয় বাক-প্রতিবন্ধী। ইতিমধ্যে গফুর মারা যায়। বড় ছেলে সলিমের বিয়ে হয়। ঘরে আসে নতুন বউ রমিজা। শুরু হয় যুদ্ধ। সলিম চলে যায় যুদ্ধে। বাড়িতে রেখে যায় কলিমকে মায়ের দেখাশুনার জন্য। পাকিস্তানীদের দোসরদের কাছে এই খবর পেয়ে মেজর কলিমকে ধরে নিয়ে যায় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের খবর দেওয়ার জন্য কলিমকে মারধোর করে। এক পর্যায়ে তারা কলিমকে তার মায়ের সামনে গুলি করে হত্যা করে।

যুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। রমিজার বাবা রমিজাকে নিয়ে যায়। গ্রামের রমজান আলীর দুই ছেলে যুদ্ধে গেছে যেনে ক্যাম্পে নিয়ে তাকে নির্যাতন করা হয়। এক রাতে অপারেশন চালিয়ে কোণঠাসা হয়ে দুই যোদ্ধা বুড়ির বাড়িতে আশ্রয় নেয়। তাদের পিছু ধাওয়া করে পাকিস্তানী বাহিনী। তারা বুড়ির বাড়িতে পৌঁছে। দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষায় একজন মা, মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচাতে তার নিজের আকাঙ্ক্ষিত সন্তানকে তুলে দেয় পাক বাহিনীর বন্দুকের নলের মুখে।

বুড়ী তখন আর শুধু রইসের মা হতে পারে না। সে তখন পুরো বাংলার মা। সকল মুক্তিরযোদ্ধার মা যাকে শুধু তার পেটে ধরা সন্তানের কথা ভাবলে চলবে না। হৃদয়বিদারক শেষ ভাগের কথা না বললেই নয়! চোখে পানি ধরে রাখা অসম্ভব ছবির শেষ দৃশ্যে। বুড়ীর কান্না সেই লক্ষ্য মায়ের কান্নারই প্রতিনিধিত্ব করে, যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা আজ স্বাধীন।

আমার কাছে এটি আমার দেখা চমৎকার একটি সিনেমা। কারণ, ১৯৭১ সালে সন্তানহারা মা বুড়ীর কান্না আমাদেরকে বারবার মনে করিয়ে দেবে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছিলাম স্বাধীনতা। মনে থাকবে সেই হাঙ্গরদের কথা, যারা আমাদের নদীতে আমাদেরই নির্বিচারে হত্যা করেছিল। সেই গ্রেনেড তুল্য ছেলেরা, যারা নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে আমাদের জন্য রেখে গেছে স্বাধীনতা।

এখানে দেশকে ভালবেসে দেশের জন্য নিজের ছেলেকে উৎসর্গ করার যে মহান দেশপ্রেম দেখানো হয়েছে তা অনেক হৃদয়স্পর্শী।

তা-ও আবার দুই মুক্তিযোদ্ধার জন্য। আর আমরা বেশির ভাগ সময়ে দেখতে পাই মুক্তিযুদ্ধের একটি চলচ্চিত্রে পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সবকিছু তুলে ধরতে চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সবকিছু এক চলচ্চিত্রে তুলে ধরা অসম্ভব। তাই সেলিনা হোসেন এই উপন্যাসটি লেখার জন্য মুক্তিযুদ্ধের শুধু একটা বা দুইটা দিক এনেছেন, আর এখানেই তিনি অন্য সব লেখার তুলনায় অনন্যতার পরিচয় দিয়েছেন। যার ফলে চলচ্চিত্রটি আলাদা এক ধরনের তাৎপর্য ধারণ করেছে।

চলচ্চিত্র সমালোচক: মোস্তাক বারী ফাহিম
ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
চলচ্চিত্র সমালোচনাটি মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটি আয়োজিত মুভি রিভিউ প্রতিযোগিতায় পুরস্কারজয়ী।






 খুঁজুন