চলচ্চিত্র সমালোচনা
ইউরোপ   স্পেন   পেইন অ্যান্ড গ্লোরি

 

চলচ্চিত্র: পেইন অ্যান্ড গ্লোরি
পরিচালক: পেদ্রো আলমোদাভর
কলাকুশলী: আন্তনিও ব্যান্দেরাস, পেনেলোপে ক্রুজ, লিওনার্দো সাবারাগিলা
দেশ: স্পেন
গাল: ২০১৯
রেটিং: ৩.৫/৫

 

একটি ব্যক্তিগত ছবি

  ছন্নছাড়া অভাব

১১ নভেম্বর, ২০১৯

কোন গল্প নেই। একেবারে ব্যক্তিগত বয়ান। এমনকি নেই কোনো দ্বন্দ্বও। শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে পুরনো দিনগুলোর স্মৃতিচারণ। তার ভেতর থেকেই হয়তো উঠে এসেছে নাটকীয় কোনো উপাদান। কিংবা ছবির কোনো ঘটনার সঙ্গে মিলে গেছে দর্শকের জীবন যন্ত্রণার কোনো ঘটনা। এই নিয়ে ছবি পেইন অ্যান্ড গ্লোরি। পরিচালক স্পেনের চলচ্চিত্রকার পেদ্রো আলমোদাভর।

কথা উঠেছে, ছবিটি আলমোদাভরের ব্যক্তিগত কাহিনি। বলা চলে তাঁর জীবনীও। তবে ঘটনাগুলো কতখানি সরাসরি তা জানা যায়নি। ছবিতে যে আলমোদাভরের জীবনের ছাপ উঠে এসেছে তা বলা চলে। ছবিটিকে খানিক মিলিয়ে নেওয়া যায় আলফনসো কুয়ারনের রোমা ছবিটির সঙ্গে। রোমা কুয়ারনের জীবনীভিত্তিক সিনেমা নয়। তবে এই ছবিতে কুয়ারনের শৈশবের ছাপ মেলে, তা পরিস্কার। পেইন অ্যান্ড গ্লোরিও তাই। সালভাদর মালোরূপী আন্তোনিও ব্যান্দেরাস আসলে পেদ্রো আলমোদাভরই।

সালভাদর মালো একজন চলচ্চিত্রকার। তিনি ভুগছেন শরীরের নানা ব্যাথায়। শুটিং স্পটে যাওয়ার মতো শারীরিক অবস্থা তার নেই। একজন সৃজনশীল মানুষ। কোনো কাজ করতে পারছেন না। তাকে বাসায় শুয়ে থাকতে হচ্ছে। এই যন্ত্রণাকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে এনেছেন আলমোদভর। কোনো উত্তেজনা নেই। শিথিল যন্ত্রণা যেন কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে সালভাদরকে। তাই বিছানায় শুয়ে সে স্মৃতিচারণ করে। উঠে আসে তাঁর শৈশব, মায়ের সঙ্গে তাঁর দিনযাপন, গ্রামের পরিবেশ, চলচ্চিত্রের দিকে আগ্রহ। উঠে আসে নানা মানুষের সঙ্গে তাঁর শৈশব ও তারুণ্যের স্মৃতি।


একদম সোজাসাপ্টা গল্প বলেননি আলমোদাভর। চলচ্চিত্র কিংবা সাহিত্যের ভাষায় যাকে বলে লিনিয়ার। নন লিনিয়ার ধারাকেই বেছে নিয়েছেন পরিচালক। তাতে বৈচিত্র্যও উঠে এসেছে ছবির ভাষায়। তা না হলে এত শিথিল একটি ছবি মুখ থুবড়ে পড়তে পারত। ছবিটি এগিয়েছে কখনো ফ্ল্যাশব্যাকে। কখনো বা কোনো চরিত্র ধরে তার পেছনের গল্প খুঁজতে খুঁজতে। এভাবে কখনো বর্তমান, কখনো অতীত-এমন করেই এগিয়েছে ছবির কাহিনি।

যেহেতু কোনো গল্প নেই, তাই কোনো কাহিনির লাইনআপ নেই। এইটুকু বলা যায়, চলচ্চিত্রকার সালভাদর মালো অসুস্থ। কিন্তু তার মন জুড়ে আছে চলচ্চিত্র তৈরির নেশা। কী করবেন? সৃজনশীল মানুষের কাজ না করতে পারার যন্ত্রণা বাসা বাঁধে তার জীবনে। একাকী বাসায় বসে স্মৃতিচারণই হয়ে উঠে প্রধান কাজ। তাতে উঠে আসে তাঁর জীবনের নানা ঘটনা। এর মাঝে নিজের যন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে ঝুঁকে পড়েন হিরোইনের নেশায়ও।

এই ছবি কেন দেখবেন তাহলে? এর কোনো কারণ নেই। আমি মনে করি, শিল্প তৈরি মানুষের একদমই ব্যক্তিগত ব্যাপার। তা অনুভব করাও ব্যক্তিগত ব্যাপার। আপনি ছবিটি দেখে হয়তো ভাবতে পারেন, আসলে ছবিটি দেখা আপনার বিফলে গেল কি-না। এর আগে কিছুই বলা যাচ্ছে না। কারণ ছবিটি দেখাও আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে ছবিটি দেখার পরে আমার অভিজ্ঞতাকে আপনার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারি। শুধু এতটুকুই।


একটা যন্ত্রণাকাতর বিষয় এত সংবেদনশীল, কোনো উত্তেজনা ছাড়া যে উপস্থাপন করা যা, তার নজির এই ছবি। কেমন জলের মতো গড়িয়ে গড়িয়ে পড়বে। কিন্তু এতটুকু বিরক্ত করবে না। সহজ সাবলীল। কোথাও কোথাও আপনাকে সূচের মতো বিঁধবে কিন্তু আপনি চুপ করে থাকবেন। উচ্চস্বরে চিতকার করতে পারবেন না। এটি এমন ছবি। আপনি যদি ঋত্বিক ঘটকের ছবি দেখে থাকেন, তাহলে এই ছবি ঠিক তার উল্টো। ঋত্বিক যন্ত্রণায় চিতকার করেছেন। আর আলমোদাভর যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেছেন, কিন্তু অবিচল, শীতল।

আরেকটি ভয়বাহ ব্যাপার আছে ছবিটির মাঝে। যন্ত্রণায় দগ্ধ একটা মানুষ যে তার স্থিরতা দিয়েও যন্ত্রণা বোঝাতে পারেন, এটা ঘটাতে তো একজন দক্ষ অভিনেতা চাই। যিনি পুরো ব্যাপারটি বুঝে মনে ও দেহে চরিত্রটি ধারণ করতে পারবেন। আন্তোনিও ব্যান্দেরাস তাই করে দেখিয়েছেন। কতটা সাবলীল অভিনয় করা যায়, তার চূড়ান্ত রূপ যেন এটি। কান কর্তৃপক্ষ এমনিতেই সেরা অভিনেতার পুরস্কারটি তাঁকে দেয়নি। সর্বপোরি সংবেদনশীল একটি ব্যক্তিগত সিনেমা দেখতে চাইলে, পেইন অ্যান্ড গ্লোরির বিকল্প নেই।

তবে মনে রাখবেন, ব্যক্তিগত মানেই কিন্তু আন্তর্জাতিক। ভুল বুঝবেন না। আর বিরক্তির একটা জায়গা বলে শেষ করি। অনেক লম্বা লম্বা সংলাপ আছে। একটু হাঁপিয়ে তুলতে পারে। ভয় পাবেন না।





 খুঁজুন