চলচ্চিত্র সমালোচনা
এশিয়া   বাংলাদেশ   শাহেনশাহ

 

চলচ্চিত্র: শাহেনশাহ
পরিচালক: শামীম আহমেদ রনী
কলাকুশলী: শাকিব খান, নুসরাত ফারিয়া, রোদেলা জান্নাত প্রমুখ।
দেশ: বাংলাদেশ
সাল: ২০২০
রেটিং: ৪/১০

 

কলকাতার ঢঙে মোড়ানো ছবি

  সিনেঘর ওয়েব দল

১৪ মার্চ, ২০২০

পুরোনো গল্প, দুর্বল নির্মাণ
শাহেনশাহকে এক কথায় বলা যায় চকচকে বোতলে পুরোনো মদ। তবে মদ থেকে বাংলাদেশী না কলকাতার গন্ধ আসে। শামীম আহমেদ রনির বিরুদ্ধে ছবি নকল করার অভিযোগ আছে। শাহেনশাহ কতটুকু নকল তা বলা যাচ্ছে না। তবে এই ছবি যে আগাগোড়া কলকাতার ঢঙে মোড়ানো তা বলা যায়।

গল্প
পরিচালক গল্প হিসেবে বেছে নিয়েছেন দুই ভাইয়ের বিরোধ। সেই বিরোধের মধ্যে ঢুকে পড়েন শাহেনশাহ নাম এক অপরিচিত যুবক। শাহেনশাহ এসে নানা ধরনের তেলেসমাতি তৈরি করেন। দর্শককে আগ্রহ জাগানোর চেষ্টা করা হয় শাহেনশাহ এর পরিচয় জানতে। তাই পরিচয় জানতে গিয়েই দর্শক ঢুকে পড়েন ছবির মূল গল্পে। যদিও ফর্মূলার সিনেমার এটা খুবই পুরোনো গল্পের কাঠামো। তাই পুরোনো গল্পকে ২০২০ সালে এসে বলতে গেলে যে মুনশিয়ানা ও গিমিক দরকার অতটুকু গিমিক করতে পারেননি পরিচালক। অগত্যা প্রথমাংশে গল্প তাই ঝুলে পড়ে। পুরোনো গল্প এখন কেন সিনেমা হলে দেখতে যাবে সে পশ্ন দেখা দেয় দর্শকের মনে।

গল্প বলার ঢঙ
ছবিটি প্রযোজনা করেছে শাপলা মিডিয়া। শাপলা মিডিয়ার সঙ্গে কলকাতার টালিগঞ্জের সম্পর্ক বেশ মজবুত। সে কারণেই নাকি শামীম আহমেদ রনির নিজস্ব খায়েস তা বোঝা যায় না, গল্প বলার ঢঙে কলকাতার প্রভাব সবজায়গায়। এই যেমন ধরুন, ছবির প্রথমাংশ একেবারেই ঝুলে গেছে। অর্থাত শাকিব খানের পরিচয় প্রকাশের আগ পর্যন্ত। সবাইকে এখানে কমেডি অভিনয় করানোর একটা ব্যাপার দেখা গেছে। কলকাতার কমেডি ছবিগুলোতে এগুলো হরহামেশাই দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের এফডিসির ঘরানার ছবিগুলোর গল্পবলার একটা ঢঙ আছে। সেটাকে বাদ দিয়ে পরিচালক কলকাতার ঢঙ নকল করায় না হয়েছে কমেডি, না হয়েছে সিরিয়াস কিছু। বরং সবার অভিনয় মনে হয়েছে এখনকার নাটকের ভাড়ামো অভিনয়ের মতো। আবার ঠিকই পরের অংশে সবাই যখন সিরিয়াস অভিনয়ে চলে আসেন, তখন খুব একটা মন্দ লাগেনি। সিনেমা ঝুলেও যায়নি। শুধু তাই না, শামীম আহমেদ রনি কলকাতার নকল করতে গিয়ে বাংলাদেশের নবাবগঞ্জের এক মুসলিম নবাবের বাড়িতে হোলি খেলারও উতসব করে ফেলেছেন। তিনি এটাও বেমালুম ভুলে গেলেন, মুসলিম ধর্মের মধ্যে হিন্দু ধর্মের গোঁজামিল এখানকার দর্শকেরা সহজে মেনে নেবে না। নাকি ইচ্ছা করেই ঢুকিয়ে দিয়েছেন, তাও চিন্তার বিষয়।

সংলাপ
সংলাপ শুনলে ধন্দে পড়ে যেতে হয়। আদৌ এটা বাংলা ভাষা নাকি ক্যালকেশিয়ান বাংলা বুঝতে কষ্ট হয়। মনে হয় কলকাতার কোনো ছবি দেখছি। শুধু নায়ক নায়িকা এ দেশি। কেলাবো, তামঝাম, মায়ের ভোগ এসব শব্দ বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডারে খুবই অপরিচিত। এগুলো কলকাতার নায়ক জিত কিংবা দেবদের মুখের ভাষা। এটা জোর করে শাকিব খানের মুখে ঠেঁসে দিলে চলবে কেন? আবার হিন্দি রিশতেমে…কিংবা খলনায়ক মিশা সওদাগরের মুখে উর্দু কবিতা দিলে তো চলবে না। বাংলাদেশের আলাদা সংস্কৃতি আছে। তার মানুষদের কথাবার্তারও আলাদা চলন। সেখানে অন্য কিছু জোর করে ঢুকালে তা এ দেশের মানুষ গ্রহণ করবে না। শুধু উর্দু ভাষা দিয়ে খলনায়ককে পাকিস্তানি টোন আনার চেষ্টা করলে এটা উজবুকি ছাড়া আর কিছুই হবে না। মনে রাখতে হবে উর্দু গালিবের ভাষা। এতটুকু পড়ালেখা তো পরিচালকের থাকা চাই।

তবে কি চিত্রনাট্য কলকাতার কাউকে দিয়ে লেখানো? এমন প্রশ্ন জাগে। এমনটা হওয়া স্বাভাবিক। কারণ শুধু কলকাতার শব্দ আমদানিই নয়, সংলাপের ধরনও কলকাতার সিনেমার মতো। এটা যদি অযাচিত কারণে হয়ে থাকে, তবে ভালো। কিন্তু শাপলা মিডিয়া কিংবা শামীম আহমেদ রনিরা জেনে বুঝে এটা করলে এটা বাংলা সিনেমার জন্য অশনী সংকেত। স্বাধীনতার পর থেকে জহির রায়হান, আমজাদ হোসেনরা সিনেমার একটা ভাষা তৈরি করেছেন। তার একটা পরিচিতি আছে। সেখানে সস্তা দর্শক লাভের আশায় ভজকট সৃষ্টি করলে সমস্যা। দর্শকও পাবেন না। শাহেনশাহ দর্শক খুব ভালোভাবে নেয়নি যতটা বীর সিনেমাকে নিয়েছে। আমার পাশের সিটে বসা দুইজন দর্শকই সংলাপ কলকাতার বলে আলোচনা করছিলেন।

শাকিব খান ও নুসরাত ফারিয়া জুটির প্রথম ছবি এটি। ছবি: সংগৃহীত

অভিনয়
অভিনয়ে কেউই খুব ভালো করতে পারেননি। বীর ছবিতে শাকিব খান ছিলেন ব্যতিক্রমী। এই ছবিতে নিজের খোলস ছেড়ে বেরোতে পারেননি। আর সবার অভিনয়েই কলকাতার কেমন যেন একটা ছাপ চলে এসেছে। মনে সন্দেহ জাগে, কলকাতার কাউকে দিয়ে পরিচালনা করিয়ে কি রনির নাম বসানো হয়েছে? জানি না। একটা কথা বলি, শাহেনশাহ সিনেমাতে এমপির ভূমিকায় যাকে দেখি, কলকাতার খরাজ মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় তার কাছ থেকে বের করার চেষ্টা করা হয়েছে বললে কি ভুলে হবে? তবে হ্যাঁ এই ছবির প্রাণ আমি বলব নুসরাত ফারিয়া। ছবিতে একটু গ্ল্যামার, ঝলমলে, আবেদনময়ী, সব কিছুই ছিল ফারিয়ার মধ্যে। যদিও দুই নায়িকা নুসরাত ফারিয়া ও রোদেলা জান্নাতের অভিনয়ের অংশ একেবারেই কম। গল্পেও কোনো ভ্যারিয়েশন নেই। তাই তাদের অভিনয়ের জায়গা কম। তা ছাড়া আহমেদ শরীফ, সাদেক বাচ্চু, মিশা সওদাগার, ডন, নানা শাহ সবাই উতরে গেছেন। কিন্তু চোখে লাগার মতো কোনো অভিনয় কেউ করতে পারেননি।

কারিগরী
ছবির কারিগরী দিকে মিশ্র। কিছু জিনিস ভালো কিছু জিনিস মারাত্মক বাজে। এডিটিং, মেকআপ, কন্টিউনিটি, কিছু কিছু শিল্প নির্দেশনা (সেট লাইট) ছিল দুর্বল। বিশেষ করে একটি সিকোয়েন্সে তিনটা গাড়ি দেখিয়ে প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্টের দুর্বলতা বুঝিয়ে দিয়েছেন। তবে কিছু কিছু সেট, ও লাইট দারুণ ছিল বলতে হবে। কোনো কোনো ছবির নকল বলা হলেও, নায়ক, খলনায়ক, বিশেষ করে নায়িকাদের এন্ট্রি একেবারে খারাপ ছিল না।

কেন দেখবেন
এত কিছুর পরেও ছবিটি কেন দেখবেন সেটা একটা প্রশ্ন বটে। তবে এতটুকু বলতে পারি, ছবিতে সিনেম্যাটিক লুক আছে। নাটক নাটক মনে হবে না। চিত্রগ্রাহককে সে ধন্যবাদটা দিতে হয়। সিনেমার যে প্রশস্ত ক্যানভাসের প্রয়োজন হয়, সেটি তিনি তুলে এনেছেনে। ছবিটির প্রথমাংশ ভাড়ামোটুকু বাদ দিলে, দ্বিতীয়াংশ দেখলে ভালো লাগবে। সবশেষ কথা হলো, সিনেমা ভালো কি খারাপ, তার আগে নিজের কাছেই জেনে নেওয়া দরকার সিনেমা দেখেছি কি দেখি নাই।






 খুঁজুন