চলচ্চিত্র: টেন ইয়ার্স উইথ হায়াও মিয়াজাকি
পারিচালক: কাকু আরাকাওয়া
কুলাকুশলী: হায়াও মিয়াজাকি, তোশিও সুজুকি, তাকাও ইসাহাতা।
দেশ: জাপান
সাল: ২০১৮
রেটিং: ৭/১০

 

হায়াও মিয়াজাকি: অ্যানিমেশনের ঈশ্বর

  ছন্নছাড়া অভাব

১৭ মার্চ, ২০২০

আমার এক বন্ধু একবার বলল, জানো, বাচ্চাগুলো ডোরেমন দেখে। আর হিন্দি বলে। একেবারে যা-তা অবস্থা। সেই থেকে আমি জানতাম ডোরেমন হিন্দি কার্টুন। কিন্তু ডোরেমন কার্টুনের একটি চরিত্র নোবিতার নাম যখন শুনি তখন বেশ ধাক্কা লাগে। ভাবি, নোবিতা শব্দটা কেমন জাপানি জাপানি লাগে। কৌতুহল বশত ঘাটতে গিয়ে দেখি আসলেই তাই। ডোরেমন জাপানি জনপ্রিয় একটি কার্টুন সিরিজ। যা বাংলাদেশেও ব্যাপক জনপ্রিয়।

জাপানের এই কার্টুন সিরিজ যেমন বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় তেমন কিন্তু জনপ্রিয় জাপানের কার্টুন সিনেমাও। কার্টুন যে শুধু বাচ্চাদের দেখার জিনিস না, তা বুঝিয়ে দিয়েছে জাপানের অ্যানিমেশন সিনেমা। আর জাপানের অ্যানিমেশন সিনেমাকে বিশ্ব দরবারে যিনি তুলে ধরেছেন তিনি আর কেউ নন। অ্যানিমেশন ফিল্মের গুরু হায়াও মিয়াজাকি।

এটা অনেকেই জানি। জাপানি চলচ্চিত্রকার বলতেই সবার আগে আসে আকিরা কুরোসাওয়ার নাম। হলিউডের অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড কর্তপক্ষ দুজন মানুষকে সম্মাননা দিয়েছিল। একজন কুরোসাওয়া আর আরেকজন মিয়াজাকি।

হায়াও মিয়াজাকি তাঁর চরিত্রদের সঙ্গে। ছবি: সংগৃহীত

২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই পরিচালক অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র থেকে বিদায় নেন। ২০১৩ সাল থেকে পেছনের বেশ কয়েকটি বছরকে ক্যামেরা বন্দী করেছেন জাপানি চলচ্চিত্রকার কাকু আরাকাওয়া। মিয়াজাকির শেষ দুটি ছবি পোনো দ্য উইন্ড রাইজেজ তৈরির জার্নিটা উঠে এসেছে এই সিনেমাতে। কাকু আরাকাওয়া ২০০৬ সাল থেকে মিয়াজাকির অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত ছায়ার মতো থেকেছেন। মিয়াজাকিকে এঁকেছেন ক্যামেরায়। আর তাতে উঠে এল এই পন্ডিত ফিল্মমেকারের চলচ্চিত্র যাত্রা, জীবন যাপন, দর্শন, আবেগ ও কাজ। জাপানি টেলিভিশন এনএইচকে তাদের স্ট্রিমিং সাইট অন ডিমান্ডে প্রমাণ্যচলচ্চিত্রটি প্রকাশ করেছে। নাম, ১০ ইয়ার্স উইথ হায়াও মিয়াজাকি। আজ থাকল সিনেমাটি নিয়ে পর্যালোচনা।

আমরা প্রথম পর্বে দেখি ২০০৬ সাল। এক সকালে মিয়াজাকি তার ব্যক্তিগত স্টুডিওতে ঢোকেন। সকালটা শুরু হয় এক কাপ কফি দিয়ে। মজার ব্যাপার হলো, স্টুডিওতে কোনো কাজের লোক নেই। মিয়াজাকি নিজেই কফি বানিয়ে খেয়ে কাজ শুরু করেন।

স্টুডিও জিবলির একটি ছবির দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

এই এপিসোডের নাম পোনো ইজ হেয়ার। অর্থাত পোনো ছবির আঁতুর ঘর থেকে সিনেমা হল পর্যন্ত যাওয়ার জার্নিটা দিয়ে ছবির শুরু। মিয়াজাকি কী করে একটি আইডিয়া কল্পনা করেন। ছবির শুরুর কাজ কেমন হয় তা দেখা যাবে এই পর্বে। আমরা দেখি, মিয়াজাকি কোনো গল্প কল্পনা করেন না। কোনো চিত্রনাট্য নেই। প্রথমে তাঁর কাজ শুরু হয় একটি চরিত্র নিয়ে। তারপর তিনি চরিত্রটি আঁকতে থাকেন। এক সময়ে চরিত্রটি দাঁড়িয়ে যায়। তারপর শুরু হয় স্টোরি তৈরির সংগ্রাম। এরপর মিয়াজাকি একের পর এক দৃশ্য আঁকেন। আঁকতে আঁকতেই দাঁড়িয়ে যায় তাঁর গল্প্। তারপরও ভাবনায় ডুব দিতে মিয়াজাকি পাড়ি জমান বন্ধুর বাড়িতে। সেখানে থাকেন কিছুদিন। সমুদ্রের তীরের ওই বাড়িতে সব ঝঞ্জাট পেরিয়ে মিয়াজাকি আবিষ্কার করেন তার চমতকার সব চরিত্র ও গল্প্। গল্প গুছিয়ে গেলে মিয়াজাকি স্টুডিওতে ফেরেন। শুরু করেন পরবর্তী ধাপের কাজ। শুধু তাই নয়, বন্ধুর বাসায় থাকার সময় মিয়াজাকি নিজেই বাজার করেন, কাপড় কাচেন এবং নিজের রান্না করেন। কেউ তাকে বিরক্ত করে না।

এই পর্বে উঠে এসেছে মিয়াজাকির অ্যানিমেশনের অনুপ্রেরণার কথাও। ট্রেট ব্রিটেনে একটি এক্সিবিশনে ব্রিটিশ আর্টিস্ট জন এভেরেট মিলিয়াসের আঁকা ওফেলিয়া পেইন্টিংটি দেখে তিনি মুগ্ধ হন। তার ডিটেইল কাজ মিয়াজাকিকে আকিৃষ্ট করে। তিনি বলেন, তাঁর কাজের সঙ্গে ওই সব শিল্পীদের কাজই কেবল তুলনা করা যায়।

হায়াও মিয়াজাকির সিনেমার একটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

এভাবেই মিয়াজাকিকে কাছ থেকে তুলে এনেছেন কাকু আরাকাওয়া। ৪৯ মিনিট করে চারটি পর্বে সাাজানো হয়েছে মিয়জাকিকে ঘিরে করা এই চলচ্চিত্র। উঠে এসেছে দুটি ছবির চিন্তার শুরু থেকে একেবারে সিনেমা হলে দেখানো পর্যন্ত। তবে শুধু মিয়াজাকিই নন, ছবিটিতে উঠে এসেছে মিয়াজাকির ছেলে গোরোর প্রকৌশল বিদ্যায় পড়ার পরে অ্যানিমেশনে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি। দেখানো হয়েছে একজন পরিচালকের স্ট্রাগল। স্ট্রাগল বেঁচে থাকার না, স্ট্রাগল সঠিক কাজটি প্রযোজককে উপহার দেওয়ার।

প্রথম দিকে আমার মনে প্রশ্ন জাগে, পরিচালক কেন মিয়াজাকির চলচ্চিত্রের মধ্যে গোরোকে ডেকে আনলেন। পরে আমার কাছে উত্তর ছিল, গোরোকে দিয়ে পরিচালক মিয়াজাকির তরুণ চলচ্চিত্রকার হিসেবে হয়ে ওঠার স্ট্রাগলটা হয়ত দেখাতে চেয়েছেন। তাতে সফলও তিনি। কারণ মিয়াজাকির প্রথম ছবি ফ্লপ ছিল। তারপর নিজের যোগ্যতায় অ্যানিমের গুরু বনে যান। গোরোকেও সিনেমার প্রথম দিকে উঠে আসতে বেশ খাবি খেতে হয়। চরিত্র পছন্দ হয় না প্রযোজক সুজুকির। চিন্তায় পড়ে যান। স্ট্রাগল করেন। মিয়াজাকি ধরিয়ে দেন কীভাবে করতে হবে। পরিচালকের স্ট্রাগলটাই এটা। যেখানে আটকে যাওয়া সেখান থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায় সেই পথ বের করা। এবং গোরো পথ বের করেন। সফলও হন।

গোরোর ছবি যখন সফল হয়, তখন মিয়াজাকিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কেমন লেগেছে গোরোর ছবি। মিয়াজাকি বলেন, সামনে এগিয়ে যেতে বল। আমাকেই ভয় দেখাচ্ছে। তাই পরিচালক কাকু এই এপিসোডের নাম দিয়েছেন, গো এহেড থ্রেটন মি।

দ্বিতীয় পর্বের নাম দিয়েছেন ড্র হোয়াটস রিয়েল। মিয়াজাকি তার জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ও চরিত্র থেকেই তাঁর চরিত্রগুলো বাছাই করেন। এমনকি তার ছেলে গোরোর শৈশবের ছবি দেখেও তিনি একটি চরিত্র বানিয়েছিলেন।

হায়াও মিয়াজাকির চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

একজন চলচ্চিত্রকার শুধু কল্পনা আর লাইট ক্যামেরা অ্যাকশনের মধ্যে বেঁচে থাকে না। সে নিজেও একজন মানবীয় প্রাণি। মিয়াজাকির জীবনযাত্রায় এটিও উঠে এল। ২০১১ সালে ভয়ানক ভুমিকম্প ও সুনামি হয় জাপানে। এই আঘাত মিয়াজাকিকেও দুমরে মুচরে দেয়। মিয়াজাকি দুর্ঘটনা কবলিত এলাকায় যান স্টুডিও জিবলির টিম নিয়ে। তার সিনেমা দিয়ে কতটা সাহায্য ও উপকার করা যায় তা আলোচনা করেন টিমের সঙ্গে। তারা দুর্ঘটনা এলাকায় গিয়ে বাচ্চাদের কার্টুন একে দেন। অন্যান্য সাহায্য করেন।

এভাবেই একজন মহান চলচ্চিত্রকারের নানা দিক উঠে এসেছে এই চলচ্চিত্র সিরিজটিতে। শেষ পর্ব ছিল মিয়াজাকির শেষ ছবি দ্য উইন্ড রাইজেজ এর কাজ নিয়ে। মিয়াজাকির এই পর্বটি শুরু হয় শরীরচর্চা দিয়ে। বোঝা যায়, বার্ধক্য এসে গেছে। মিয়াজাকি কিছুটা খিটখিটেও। সহকর্মীদের কাজ একেবারে নিঁখুত না হলে অনুমতি দিচ্ছেন না। নিজে সেগুলো নিঁখুত করছেন। একটি মজার বিষয় দেখা গেল। সবাই পেন্সিল ও কাগজে কাজ করছেন। যতক্ষণ না ঠিক হচ্ছে ততক্ষন নতুন কাজ ধরছেন না। আঁকছেন আর ফেলছেন ডাস্টবিনে। খুবই বিরক্তিকর এই যাত্রা। কারণ পুরো ছবিতে পেইন, হ্যাসেল শব্দ দুটি যেন মিশে ছিল মিয়াজাকির মুখে। আর ঠোটে চারমিনা। ফিল্ম বানানো তাঁর কাছে পেইন ও হ্যাসেল। মিয়াজাকিকে প্রশ্ন করা হলো, এত পেইন ও হ্যাসেল হলে এই কাজ ছেড়ে দিচ্ছেন না কেন? মিয়াজাকি অবাক করা উত্তর দেন। তিনি বলেন, জীবনটাই তো পেইন ও হ্যাসেল। তাই বলে কি জীবন থেকে পালিয়েছি?

হায়াও মিয়াজাকির সিনেমার একটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

মিয়াজাকিকে একেবারে কাছ থেকে দেখার চলচ্চিত্র টেন ইয়ার্স উইথ হায়াও মিয়াজাকি। চলচ্চিত্রটিতে কোনো ভান নেই। আরোপিত নয়। তাই ভালো লাগে। তবে ছোট একটু আক্ষেপ ছিল। ধারা বর্ণনা আরেকটু পরিপক্ক ও মিয়াজাকির ব্যাক্তিগত জীবনের কিছু অংশ থাকলেও হয়তো ভালো লাগত। ক্যামেরা শুধু স্টুডিওতেই ছিল সীমাবদ্ধ।

সেই যাই হোক। চলচ্চিত্রটি অনায়াসে দেখে ফেলা যায়। শেষ পর্বটি সাজানো হয়েছে মিয়াজাকির শেষ ছবি নিয়ে। এটি মিয়াজাকিরও অতি আবেগরে ছবি। কারণ এই ছবির উদ্বোধনী প্রদর্শনীর পরে মঞ্চে মিয়াজাকি বলেছিলেন, এটাই তাঁর একমাত্র ছবি, যা দেখে তিনি কেঁদে ফেলেন। ছবিটি জাপানে সাড়া জাগায়। বক্স অফিস সফল হয়।

মিয়াজাকির সঙ্গে দর্শক হিসেবে আমরাও এগিয়ে যাই সমান্তরাল। যেন মিয়জাকি ঘরের পাশের প্রতিবেশী। প্রতিদিন দেখা হচ্ছে। তার খোঁজখবর পাওয়া যাচ্ছে। হঠাতই ধারা বর্ণনাকারী ঘোষণা করেন এর দুই মাস পর মিয়াজাকি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র থেকে বিদায় নেন। শুনে বুকের ভেতর ছ্যাত করে উঠে। যেমন উঠে, হঠাত প্রতিবেশি কারো মৃত্যু সংবাদ শুনলে, যার সঙ্গে সকালেও দেখা হয়েছে।







 খুঁজুন