চলচ্চিত্র সমালোচনা
এশিয়া   ভারত   টোবা টেক সিং

 

চলচ্চিত্র: টোবা টেক সিং
পরিচালক: কেতন মেহতা
কলাকুশলী: পঙ্কজ কাপুর, বিনয় পাঠক, গৌরব দিবেদী, নান্দ কিশোর প্রমুখ।
দেশ: ভারত
সাল: ২০১৮
রেটিং: ৭/১০

 

সরাসরি বুকে গিয়ে বিঁধে

  হৃদয় আহমেদ

২৬ এপ্রিল, ২০২০

টোবা টেক সিং ২০১৮ সালে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম জি ফাইভে মু্ক্তি পাওয়া একটি ড্রামা এবং হিস্ট্রি ঘরানার ভারতীয় হিন্দি ভাষার সিনেমা। সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন কেতন মেহতা। অভিনয় করেছেন পঙ্কজ কাপুর, বিনয় পাঠক, গৌরব দিবেদী এবং নান্দ কিশোরসহ আরও অনেকে।

প্লট: অবিভক্ত ভারতের অন্যতম প্রাচীন মানসিক আশ্রয়স্থলের (পাগলাগারদ) গল্প এটি। সময়টা ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের ঠিক আগে। লাহোরে অবস্থিত এই মানসিক আশ্রয়স্থলে থাকেন, মুসলিম, হিন্দু ও শিখ ধর্মসহ বিভিন্ন ধর্ম এবং বর্ণের মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষ। মানসিক আশ্রয়স্থলে থাকা প্রত্যেকটা মানুষেরই ছিল আলাদা আলাদা গল্প। কিন্তু এখানে থাকা বিজন সিংয়ের কাহিনি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

টোবা টেক সিং নামের একটি এলাকা থেকে এই মানসিক আশ্রয়স্থলে এসেছিল বিজন সিং, তাই বিজন সিংকে সবাই টোবা টেক সিং নামেই ডাকে। টোবা টেক সিং গত দশ বছর ধরে এই আশ্রয়স্থলে আছে কিন্তু গত দশ বছরের মধ্যে কখনো সে কোনো যায়গায় বসেনি। সবসময় দাঁড়ানো অবস্থায় থাকে এমনকি গত দশ বছরে কখনোই তাকে কেউ ঘুমাতে দেখেনি।

১৯৪৭ সালের আগে হঠাৎ দাঙ্গা শুরু হয়। হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যের এই দাঙ্গায় শিশু থেকে বুড়ো কেউই বাঁচতে পারছে না। এরই মধ্যে ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন গভর্নর মানচিত্রের উপর দাগ এঁকে ব্রিটিশ ভারতকে ভাগ করে হিন্দুস্তান আর পাকিস্তান নামে দুটি দেশ বানিয়ে দেয়। ১৪ এবং ১৫ ই আগস্ট স্বাধীন হয় দুটি দেশ। শুরু হয় আলাদাভাবে দুটি দেশের স্বাধীন যাত্রা।

এরই মধ্যে ১৯৫০ সালে ঠিক হয় যে দুই দেশে থাকা পাগলদেরও ভাগাভাগি করা হবে। সব পাগল স্বাধীনতার মানে খুঁজতে থাকে। সবাই খুঁজতে থাকে তাদের দেশ কোনটা। বিজন সিং আশ্রয়স্থলের সবাইকে জিজ্ঞেস করতে থাকে যে, তার টোবা টেক সিং এলাকা কোন দেশে পড়েছে।

পাগলদের কি আদৌ ভাগাভাগি করতে পারবে? তারা কি তাদের বর্তমান আবাসস্থল ছেড়ে যেতে চাইবে? আর টোবা টেক সিং পাকিস্তানে পড়েছে নাকি ভারতে? এমন প্রশ্ন উঠে আসে ছবির গল্পে।

পরিচালনা: কেতন মেহতা একজন অসাধারণ নির্মাতা। তিনি সর্দার, মঙ্গল পান্ডে ও মাঝি দ্য মাউন্টেন ম্যান-এর মতো অনবদ্য সিনেমার নির্মাতা। কেতন মেহতা ৪৭ এর দেশভাগ নিয়ে অনেক কাজই করেছেন, তাই এই সিনেমাটা নির্মাণ করা তার জন্য চ্যালেঞ্জিং কিছু ছিল না। কিন্তু তবুও সাদাত হাসান মান্টোর ‘টোবা টেক সিং‘ গল্পের অনূভুতি, শিক্ষা, দর্শন ধরা এত সহজও ছিলো না হয়ত। তবে, কেতন মেহতা গল্পের প্রত্যেকটি বিষয় সুক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করি।

গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ: সিনেমার গল্পটি নেওয়া হয়েছে সাদাত হাসান মান্টোর ‘টোবা টেক সিং‘ নামের গল্প থেকে। সাদাত হাসান মান্টোকে যারা চেনেন বা তাঁর বই/গল্প যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন মান্টো কী পরিমাণ সমাজ বাস্তবতা, দেশভাগের দুর্দশা, চিন্তা চেতনা তাঁর লেখায় ফুটিয়ে তোলেন। দেশভাগ নিয়ে তাঁর যতগুলো সেরা লেখা আছে, তার মধ্যে ‘টোবা টেক সিং‘ একটি।

সিনেমাটির চিত্রনাট্য এবং সংলাপ লিখেছেন কেতন মেহতা এবং উদিৎ চন্দ্র। চিত্রনাট্য যথেষ্ট ভালো, আপনি যতই দেখবেন ততই সিনেমার চিত্রনাট্য আপনাকে গভীরে টেনে নিবে। সংলাপের কথা বললে বলতে হবে যে, হৃদয়স্পর্শী এবং বাস্তবসম্মত। সিনেমার গল্প যেমন বাস্তবতার কথা বলে তেমনি সিনেমার প্রত্যেকটি সংলাপ বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। কিছু কিছু সংলাপ সরাসরি বুকে গিয়ে বিঁধে যায়।

টোবা টেক সিং চরিত্রে পঙ্কজ কাপুর। ছবি: সংগৃহীত

অভিনয়: সিনেমাতে টোবা টেক সিং চরিত্রে অভিনয় করেছেন পঙ্কজ কাপুর এবং সাদাত হাসান চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিনয় পাঠক। টোবাটেক সিং এর চরিত্রে পঙ্কজ কাপুর অনবদ্য অভিনয় করেছেন, তাঁর অভিনয় দেখে আপনি মুগ্ধ হতে বাধ্য। অন্যদিকে বিনয় পাঠক এর অভিনয় দুর্দান্ত, সিনেমায় তার চরিত্রটা অন্য ধরনের এক মুগ্ধতা তৈরি করেছে।

অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করা সবাই-ই যথেষ্ট ভালো কাজ করেছেন।

সংগীত: সিনেমার সংগীত পরিচালনা এবং আবহ সংগীত পরিচালনা করেছেন অনুরাগ সাইকিয়া। তাঁর তৈরি করা গানগুলো হৃদয়স্পর্শী। তার সঙ্গে সিনেমার আবহসংগীত অসাধারণ।

চিত্রগ্রহণ: রক্তিম চন্দ্রালের করা চিত্রগ্রহণের কাজ সত্যিই মুগ্ধ করেছে। সিনেমার প্রত্যেকটা শট যেন এক একটা গল্প।

সম্পাদনা: উদিৎ চন্দ্রাল এবং শাইলেশ গুপ্তার সম্পাদনা অসাধারণ। সিনেমার দৈর্ঘ্যও একদম ঠিকঠাক, দর্শকদের বিরক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

টোবা টেক সিং সিনেমাটি সত্যিকার অর্থেই মুগ্ধ করার মতো একটি সিনেমা। যা আপনাকে অনেকগুলো প্রশ্নের মুখে ফেলে দিবে।
স্বাধীনতা কি?
আমরা কেমন স্বাধীনতা চাই?

একটি মানচিত্রকে কলমের দাগ দিয়ে ধর্মের উপর ভিত্তি করে আলাদা করে দিক এটা কি তখনকার মানুষ আদৌ চেয়েছিল?

যে স্বাধীনতা আমাদের ভাগ করে দেয়, যে স্বাধীনতা আমাদের দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করে সেই স্বাধীনতার কি দরকার ছিল?
এমন অনেক প্রশ্নের মুখামুখি হবেন সিনেমাটি দেখলে। সিনেমাটিতে তৎকালীন দাঙ্গার কিছু ফুটেজ দেখানো হয়েছে, যা দেখে সত্যিই আপনার মনে হবে যে `এটা স্বাধীনতা‘?

কিছু কিছু সংলাপ এবং দৃশ্য দেখে আপনি কাঁদতে বাধ্য। আর শেষের দৃশ্য নিয়ে কী বলবো। আপনারাই দেখে নিয়েন। সময় থাকলে এখনই দেখে নিতে পারেন সিনেমাটি। আশা করি ভালো সময় কাটবে।






 খুঁজুন