চলচ্চিত্র সমালোচনা
আমেরিকা   আমেরিকা   এক্সট্রাকশন

 

চলচ্চিত্র: এক্সট্রাকশন
পরিচালক : স্যাম হারগ্রেভ
কলাকুশলী: ক্রিস হেমসওয়ার্থ, রনদীপ হুদা, রুদ্রকেশ জেসওয়াল, গুলশিফতেহ ফারহানি, পঙ্কজ ত্রিপাঠি প্রমুখ।
দেশ: আমেরিকা
সাল : ২০২০
রেটিং: ৬/১০

 

ভালো লাগেনি বাংলাদেশী দর্শকদের

  মারুফ হাসান ইমন

৩০ এপ্রিল, ২০২০

প্রাককথা
মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই এক্সট্রাকশন ছবিটি নিয়ে দারুণ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। দেশের বাইরে ছবিটিকে একটি নিছক অ্যাকশন নির্ভর নতুন বোতলে পুরনো মদের মতো বলা হলেও বাংলাদেশের দর্শকেরা এটিকে বেশিরভাগই রূপ দিচ্ছেন সমালোচনার ছাঁচে। যেখানে নেটফ্লিক্সের মতো আন্তর্জাতিক ও বহুভাষী দর্শকের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ঢাকাকে দেখতে একটা বাড়তি আগ্রহ ছিলো, সেখানে ছবির বাদবাকি আলাপ ছাড়িয়ে মুখ্য হয়ে গেছে ছবির লোকেশন।

কেননা, ঢাকার সেট বানিয়ে শুটিং করা হয়েছে ভারতের আহমেদাবাদে। স্বভাবতই এ দেশীয় দর্শকদের ক্ষোভের জায়গা তৈরি হতে পারে ভুলভাল বাংলা আর ঢাকার নকল চিত্রায়নে। সিনেমার নাম হবার কথা আসলে `সুয়েডাড ডেল স্টে‘, যে কমিক লেখাটির আলোকে ছবির গল্প তা প্যারাগুয়ের এই শহরের ওপর ভিত্তি করেই। তবে এরপর একবার আউট অব দ্য ফায়ার নাম দিয়ে আবার ২০১৮ সালের আগস্টে ঘোষণা দেওয়া হয় ছবির নাম হবে ঢাকা। ওই বছরেরই নভেম্বর মাসে ভারতের আহমেদাবাদে ঢাকার সেট বানিয়ে শুট শুরু হয়। এরপর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় এক্সট্রাকশন। তবে সব সমালোচনা ছাপিয়ে সিনেমা হিসেবে এক্সট্রাকশন কেমন আসুন দেখি।

গল্প
এককথায় সিনেমার গল্প আমাদের বাংলাদেশের আর দশটা মেলোড্রামার মতোই। ভাড়াটে গুন্ডার মনে জন্ম নেয়া সহানুভূতিতে জসিম মান্না কিংবা আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডনদের টক্কর এদেশের সিনেমায় আহমেদ শরীফ, রাজিবরা সেই কবেই করেছেন। কথা শুনে ভ্র কুঁচকালেও কথা সত্যি। টাইলার রেক একজন মার্সেনারি যে টাকার বিনিময়ে অপরাধজগতের লোকদের কাজ করে দেয়। ভারতের অন্যতম মাদকসম্রাট অভি মহাজন সিনিয়রের ছেলে জুনিয়র মহাজনকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যায় তার পুরনো শত্রু আমির আসিফ। আমির আবার বাংলাদেশের বড় ড্রাগ লর্ড যার কথায় দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ওঠে বসে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলো সাজু, যে জেলে থাকা সিনিয়র মহাজনের হয়ে কাজ করে।

অভির এই কিডন্যাপের জন্য সিনিয়র তাঁকে দায়ী করে এবং যে করেই হোক তার ছেলেকে ঢাকা থেকে উদ্ধার করে আনতে বলে। সাজু যখন বলে এতে অনেক ফোর্স, টাকা লাগবে সিনিয়র মহাজন জানায় এটা টাকার ব্যাপার নয়, মর্যাদার ব্যাপার। সাজুকে তাঁর পরিবার নিয়েও হুমকি দেয় মহাজন। সাজু নিজের পরিবারের দিকে চেয়ে অভিকে খুঁজতে সাহায্য চায় মার্সেনারির। নিক হলো টাইলারের মার্সেনারি গ্রুপের মধ্যস্ততাকারী।

টাইলার মিশনে নেমে সূত্রের সাহায্যে ঢাকার একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার টিনেজ গ্যাংয়ের কাছ থেকে অভি জুনিয়রকে নিয়ে যায়। সাজু তখনো জানে না আসলে কে অভিকে তুলে নিয়ে গেছে। টাইলার অভিকে নিয়ে তার দলের সাহায্যে নিরাপদ দূরত্বে যাবার সময় বাধা হয় সাজু এবং যথারীতি সাজুকে পরাস্থ করে টাইলার অভিকে নিয়ে যায়। এদিকে আমির আসিফের কানে এই খবর গেলে সে পুরো সরকারী বাহিনী নিয়ে খুঁজতে থাকে টাইলারকে।

আমিরকে টিনেজ গ্যাংয়ের ফরহাদ কথা দেয় যেভাবেই হোক সে টাইলারকে ধরবে। একসময় ঠিকই ফরহাদের মুখোমুখি হয় টাইলার এবং কোনরকমে বেঁচে যায়। অভির সাথে টাইলারের অল্পসময়ের একটি সহানুভূতির সম্পর্ক তৈরি হয় কেননা টাইলারের নিজের ছেলেও রোগে মারা গেছে। অভির অসহায়ত্বে টাইলার যেন নিজের পিতৃত্বকে মেলাতে থাকে। তাই নিক বিপদ বুঝতে পেরে অভিকে ছেড়ে দিতে বললেও টাইলার রাজি হয় না। সে যে করেই হোক অভিকে নিরাপদে ঢাকা থেকে বের করে নিকের হাতে দিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়। শেষপর্যন্ত সে তার কথা রাখতে পারে কীনা বা তার শেষতক কি পরিণতি হয় তা জানতে আপনাকে পুরো ছবি দেখতে হবে।

এক্সট্রাকশন ছবির দৃশ্য। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

পরিচালনা
স্যাম হারগ্রেভের এটিই প্রথম ছবি। তিনি মূলত এর আগে মারভেলের রুশো ভাইদের অ্যাভেঞ্জার্স কিংবা ক্যাপ্টেন আমেরিকার মতো ছবিগুলোতে স্ট্যান্টম্যান, অ্যাকশন দৃশ্যের কাজ করেছেন। ক্যাপ্টেন আমেরিকাতে তিনি বডি ডাবল হিসেবেও অনেক শট দিয়েছেন। একজন মারপিট জানা লোক পরিচালক হলে যা হয় তাই হয়েছে, পুরদস্তুর মারপিট ছিলো ছবিতে। অ্যাকশন দৃশ্যে ওয়ান টেক শটে প্রায় আট দশ মিনিটের শট যেখানে মূলত টাইলারের সাথে বাংলাদেশের ‘এলিট’ নামক বাহিনীর লড়াই আর সাজুর সাথে হ্যান্ড ফাইট ছিলো তা সত্যিই দেখার মতো। গল্প অনুসারে পরিচালনা ভালো হলেও একজন পরিচালককে যদি জাহাজের নাবিক হিসেবে দেখা হয় সেক্ষেত্রে স্যামের এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।

দৃশ্যায়ন
সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে নিউটন থমাস সিগেল এই ছবির অন্যতম তৃপ্তির ঢেকুর। খুব কম লোকই বলবে এ ছবির ক্যামেরার কাজ খারাপ। ঢাকাতে এসে এখানকার পুরান ঢাকা, বাবুবাজার ব্রিজ কিংবা বুড়িগঙ্গার দারুণ কিছু ড্রোনের শট আগেই নিয়েছিলেন নিউটন, সঙ্গে রেখেছিলেন এ দেশীয় সহকারী দীপনকেও। এ ছাড়া অ্যাকশন দৃশ্যে তাঁর ক্যামেরা মুভমেন্ট, ক্লোজ শট, ফ্রন্ট শট, ওয়ান টেকগুলো ভাল ছিলো।

অভিনয়
‘থর’ মানে ক্রিস হেমসওয়ার্থ, রুদ্রাক্ষ জেসওয়াল আর রনদীপ হুদা বাদে বাকিদের খুব একটা চ্যালেঞ্জিং অভিনয় করতে হয়েছে তা বলব না। আমির আসিফ চরিত্রে অভিনয় করা প্রিয়াংশু এর আগে নেটফ্লিক্সের আপস্টার্টস এও অভিনয় করেছেন কিন্তু ভাষাগত বা বাচন দুটোতেই এই ছবিতে তাকে ভালো পছন্দ মনে হয়নি। একজন আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডনের চরিত্র যেভাবেই সিনেমাটিক লিবার্টিতে ভাবি না কেন এতটা নিষ্ক্রিয় মানা কষ্টকর। আর পঙ্কজ ত্রিপাঠি কিংবা কলকাতার শাতাফ ফিগার অতিথি চরিত্র হিসেবে যুতসই ছিলেন। ছবিতে প্রযোজনার পাশাপাশি অভিনয়েও এতটুকু ছাড় দেননি থর অভিনেতা ক্রিস। তার মুখে ‘প্রমাণ দাও’ শুনতে মন্দ লাগেনি। রুদ্রাক্ষ এখানে অভি মহাজন জুনিয়র হিসেবে বেশ ভালো অভিনয় করেছে, তাঁর হিন্দী বা ইংলিশ দুটোই সাবলীল ছিলো আর ইমোশনাল দৃশ্যে অভিব্যক্তি ভালোই ছিল। নিক হিসেবে ইরানি অভিনেত্রী গুলশিফতেহ গড়পড়তা ছিলেন, এখানে বোধহয় একজন ভারতীয় অভিনেত্রী কাস্ট করলেই যথার্থ হতো। তবে ডেডিকেশনের চূড়ান্ত মাত্রা ছিলো রনদীপ হুদার সাজু চরিত্রে। এই ছবির জন্য বেশ কয়েকদিন তাকে অন্যকিছুতে দেখা যায়নি। অ্যাকশন দৃশ্যগুলোর জন্য তার হোমওয়ার্ক যে বেশ ভালো ছিলো তা চোখে পড়েছে।

ছবিটির আগের নাম ছিল ঢাকা। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

ইতিবাচক দিক
আপনি একজন অ্যাকশন মুভির ভাল দর্শক হলে এক্সট্রাকশন আপনার জন্য ভাল সময় নিয়ে আসবে। এটি দুর্দান্ত কিছু মারপিট, চেজিং, বানানো ঢাকার আবহে ঘিঞ্জি পরিবেশে অ্যাকশন আর বিভিন্ন অস্ত্রের ঝানঝনানি, সাউন্ড আপনাকে বিনোদন দেবে এটি নিশ্চিত। রুশো ভাইয়েরা এর আগের ছবিগুলোতেও সবকিছুর মাঝে যে সহানুভূতি বা স্পর্শকাতর জায়গাটি বের করে আনেন তা এতেও আছে। তাই চেনা গল্প আপনার কাছে এর পরিবেশনের খাতিরে অচেনা স্বাদ দিতে পারে।

নেতিবাচক দিক
আমি একজন বাংলাদেশী না হলে হয়তো ছবিটির এই নেতিবাচক দিকগুলোকে আর দশটা সিনেমার মতো দেখে ফেলে রেখে ঘুমোতে যেতে পারতাম। কিন্তু ভুলভাল বাংলা উচ্চারণ যা কলকাতার একসেন্ট বলাই ভালো তা বাজেভাবে কানে লাগছে। যে ঢাকাকে রোজ দেখি তা এমন প্ল্যাটফর্মে প্রথমবার এভাবে দেখব আশা করিনি। বারবার মনে হচ্ছিলো গৃহযুদ্ধে পর্যদুস্ত আফ্রিকান কোন শহর দেখছি যেখানে এমন টিনেজ গ্যাং ভারী অস্ত্র নিয়ে চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। হলুদ কালারাইজেশনে ঢাকাকে শুরুতেই যেভাবে অপরাধের নগরী হিসেবে সামনে আনা হয়েছে তা পুরোটা হজম করতে পারিনি।

সবচেয়ে বড় কথা, ঢাকায় শুটিং ঢাকায় না হয়ে যখন আহমেদাবাদে হয়েছে তখন প্রোডাকশন টিমের সেট বিন্যাসে যথেষ্ট সচেতন থাকা দরকার ছিল। ঢাকায় শুধু সিএনজি আর ময়লা গলি নেই এটা তাদের কে বোঝাবে। এলিট ফোর্স র‍্যাবকে দেখানোর নামে দেখানো হলো এলিট নামের এক ‘ফোস’কে, কি কারণে দেশের সমস্ত বাহিনি এক ডনের কথায় লকডাউন করে দিলো শহর তা বোধগম্য হয়নি। এটাও হিসেব মেলাতে পারিনি তথাকথিত সুলতানা কামাল ব্রিজ ভারতের খুব কাছে কিনা বা বুড়িগঙ্গার পাশেই এমন ঘন পাথরওয়ালা জঙ্গল আছে কিনা।

পরিশেষ
যে দেশের ৫৫ লাখ লোক নেটফ্লিক্সে তাকিয়ে ছিলো তাদের ঢাকাকে দেখতে তাদের ক্ষোভ হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে এই ক্ষোভ কি সত্যিকার অর্থে কোন কাজে দেবে? ভারতের মতো দেশ যেখানে মাসে মাসে নেটফ্লিক্সের প্রোডাকশনে কাজ করছে, দেখাচ্ছে সেখানে তাদের ভাষা, তাদের অভিনেতারা কাজ করবে সেটাই স্বাভাবিক নয় কি? আমাদের দেশের তারিক আনাম কিংবা আরিফিন শুভরাও পঙ্কজ আর রনদীপের কাজটুকু বেশ করতে পারত। কিন্তু বিশ্ব বাজারে তাদের কজন চেনে, আমরাই বা কতটুকু চেনানোর কাজ করছি। আইএমডিবিতে রেটিং কমিয়ে আর টুইটার ফেসবুকে গিয়ে ওদের গালাগালি করে আমরা হয়তো সাময়িক তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারি কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী লাভে আমরা আসলে কতটা পিছিয়ে তা হিসেব করেছি? এরপরেও হয়তো কোন সিনেমা বা সিরিজে ঢাকা বা বাংলাদেশকে এভাবেই ওরা দেখাবে কারণ আমরা ওদের মগজে ঢোকার যোগ্যতা অর্জন করতে পারিনি এখনো। শেষকথা হলো, এক্সট্রাকশন কিন্তু বাইরে ভাল রিভিউ পাচ্ছে এর সিক্যুয়েল যে হবে তা তো শেষ দৃশ্য দেখে আঁচ করাই যায়।






 খুঁজুন