চলচ্চিত্র সমালোচনা
ইউরোপ   যুক্তরাজ্য   ১৯১৭

 

চলচ্চিত্র: ১৯১৭
পরিচালক: স্যাম মেন্ডেস
কলাকুশলী: জর্জ ম্যাকি, ডিন চার্লস চ্যাপম্যান, মার্ক স্ট্রং, এন্ড্রু স্কট, রিচার্ড ম্যাডেন কলিন ফার্থ।
দেশ: আমেরিকা
সাল: ২০১৯
রেটিং: ৮/১০

 

কী নেই এই সিনেমাতে?

  হৃদয় আহমেদ

১০ মে, ২০২০

প্লট: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ৬ এপ্রিল, ১৯১৭। শত্রু অঞ্চলে যুদ্ধ করার জন্য একটি আমেরিকান সৈনিকের দল জড়ো হয়। একটা সময় তাদের অন্য একটি দল জানতে পারে যে, শত্রু অঞ্চলে তাদের যে দলটি যুদ্ধটি করতে যাচ্ছে তাঁরা আসলে জার্মানি সেনাদের পাতা এক ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে। তখন দুজন সৈন্যকে আদেশ দেওয়া হয় একটি বার্তা শত্রু অঞ্চল পার হয়ে সেই দলকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

বার্তাটি না পৌঁছাতে পারলে ১৬০০ জনের সেই দলের সবাই হয়তো মারা যাবে। সেই বার্তা থেকেই সিনেমার নাটকীয়তার শুরু। দুই সৈনিক কি, তাদের জীবন বাজি রেখে শত্রু অঞ্চল পার হয়ে বার্তাটি ওই আমেরিকান সৈনিকদের পৌঁছাতে পারবে?

পরিচালনা: স্যাম মেন্ডেসের নির্মাণ দুর্দান্ত। যেন চোখের সামনে বাস্তব সবকিছু। এই পরিচালকের অন্য সিনেমার মতো এই সিনেমাও আমাকে দারুণভাবে আন্দোলিত করেছে। শুধু তাই নয়, এই সিনেমায় তিনি কিছু নীরিক্ষাও করেছেন।

গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ: সিনেমাটির গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ যৌথভাবে লিখেছেন স্যাম মেন্ডেস ও ক্রিস্টি উইলসন। সত্য একটি ঘটনার উপর ভিত্তি করে ছবিটির গল্প লেখা হয়েছে। চিত্রনাট্যও যথেষ্ট ভালো হয়েছে। একের পর এক দৃশ্য আপনাকে সিনেমার গভীরে নিয়ে যাবে। একটা সময় মনে হবে চোখের সামনে যা দেখছি তা বাস্তবতার মতোই আমার সামনে ঘটছে। সিনেমার সংলাপ হৃদয়স্পর্শী এবং অনুপ্রেরণাদায়ক, একইসঙ্গে মনে হবে সংলাপ খুবই বাস্তবসম্মত।

১৯১৭ ছবির দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

অভিনয়: প্রধান চরিত্রে অভিনয় করা জর্জ ম্যাকির অভিনয় দারুণ লেগেছে, প্রত্যেকটা দৃশ্যেই জর্জের অভিনয় মুগ্ধ করার মতো। পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করা ডিন চার্লিস চ্যাপম্যানও অসাধারণ অভিনয় করেছেন। সিনেমার অন্য শিল্পীরাও ভালো।

লোকেশন ও প্রোডাকশন ডিজাইন: সিনেমার লোকেশন আর প্রোডাকশন ডিজাইন দেখে মন জুড়িয়ে গেছে। নির্মাতা এবং লোকেশন সুপারভাইজার অসাধারণ লোকেশন খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছেন। লোকেশন দেখেই আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে। প্রোডাকশন ডিজাইনও দারুণ।

সংগীত: সিনেমার মূল সংগীত এবং আবহ সংগীতের নেপথ্যে ছিলেন থমাস নিউম্যান। তার তৈরি করা দারুণ আবহ সংগীত সিনেমাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। গল্পকে দারুণভাবে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে এই আবহ সংগীত। কিছু কিছু সুর যেন সরাসরি বুকে গিয়ে বিঁধে।

চিত্রগ্রহণ: সিনেমায় রজার ডেকিন্সের চিত্রগ্রহণ যেন এখনো চোখে লেগে আছে। এই সিনেমায় চিত্রগ্রহণের জন্য অস্কার এবং বাফটার সেরা চিত্রগ্রহণের অ্যাওয়ার্ডও গিয়েছে রজার ডেকিন্স‘র ঝুলিতে৷

যাত্রার পুরো সময়টাই ক্যামেরা খুব কাছ থেকে দুই সেনাকে অনুসরণ করে চলে। এবং এর ফলে সেই যাত্রার শরিক হয়ে ওঠেন দর্শকও। ছবিটিতে সিঙ্গেল কনটিনিউয়াস শট পদ্ধতি ব্যবহার করার ফলে মনে হয় ক্যামেরা যেন সমানে চলছে, কোনও বিরতি নেই।

এরি (ARRI) বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ক্যামেরা ডিজাইনার এবং প্রস্তুতকারক। তারা ডেকিন্সের চাহিদা অনুযায়ী এলেক্সা সিরিজের নতুন একটি ক্যামেরা নির্মাণ করেছিল। অর্থাৎ ১৯১৭ হলো প্রথম সিনেমা, যেটায় ALEXA Mini LF ক্যামেরাটি ব্যবহার করা হয়েছে। ক্যামেরাটিতে আছে বড় ফরমেটের সেন্সর, যেটা প্রাকৃতিক আলোতে শ্যুটিংয়ের জন্য বেশ উপযুক্ত।

সিনেমাটির বেশিরভাগ দৃশ্যই ধারণ করা হয়েছে ৪০ মি.মি সিগনেচার প্রাইম লেন্সে। তবে কিছু দৃশ্য, যেমন নদীতে ডিকেন্স ব্যবহার করেছিলেন ৪৭ মি.মি এবং জার্মান বাঙ্কারে ৩৫ মি.মি লেন্স।

১৯১৭ ছবির দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

সম্পাদনা: সিনেমার অসামান্য ক্যামেরা ও সম্পাদনার জন্য কুর্নিশ জানাতেই হবে চিত্রগ্রাহক রজার ডিকিন্স এবং সম্পাদক লি স্মিথকে। সম্পাদক লি স্মিথের সম্পাদনা অসাধারণ। মনে হচ্ছিলো এক শটেই শেষ হয়ে গেছে পুরো ছবি। এক সেকেন্ডের জন্যেও বোরিং হওয়ার চান্স নেই। সিনেমাটির কাটগুলো ঢাকতে তারা কিছুকিছু ক্ষেত্রে সিজিআইয়ের সাহায্য নিয়েছেন। যেমন স্কোফিল্ড। যখন জার্মান সৈন্যদের হাত থেকে বাঁচতে নদীতে ঝাঁপ দেয়, তখন এটি ব্যবহার হয়েছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা সাহায্য নিয়েছিলেন সিনেমা নির্মাণের বেশ কিছু পুরোনো কৌশলের।

মন্তব্য: ১৯১৭ সিনেমার বিশেষণ একটি শব্দ দিয়েই দেওয়া সম্ভব। সেটা হচ্ছে অসাধারণ। কী নেই এই সিনেমাতে? ভালোবাসা, আবেগ, যুদ্ধ, মায়া, ভয়, মৃত্যু; সবকিছুই আছে এই সিনেমাতে। কিছু কিছু দৃশ্যের নৃশংসতা দেখে ভয় লেগে যায়। আবার কিছু দৃশ্যের ভালোবাসা, আবেগ আর মায়াতে চোখও ভিজে যাবে। শিল্প ও শৈলীর এই মিশেলই ছবিটিকে দুটি গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার (সেরা ছবি ও সেরা পরিচালক) এবং ১০টি অস্কারের মনোনয়ন এনে দিয়েছে।





 খুঁজুন