চলচ্চিত্র সমালোচনা
এশিয়া   ভারত   গল্প হলেও সত্যি

 

চলচ্চিত্র: গল্প হলেও সত্যি
পরিচালক: তপন সিংহ
কলাকুশলী: তপন ভট্টাচার্য্য, কৃষ্ণা বসু, খগেশ চক্রবর্তী প্রমুখ
দেশ: ভারত
সাল: ১৯৬৬
রেটিং: ৭/১০

 

দেখেননি? তবে মিস করেছেন…

  আরেফিন আল ইমরান

২৬ জুন, ২০২০

ভাবতে অবাক লাগে—মাত্র কয়েক দশক আগেও এই উপমহাদেশে বিশ্বমানের বাংলা চলচ্চিত্র তৈরী হত! মেধা-মনন আর প্রজ্ঞার মিশেলে এক অভূতপূর্ব দ্যোতনা ফুটে উঠত পর্দায়। ব্যক্তি আর সমাজ জীবনের একান্ত নির্জন বিষয়গুলো উঠে আসত অপূর্ব দক্ষতায়। আরোপিত রোম্যান্টিসিজম ছিল না, বরং জীবনের নগ্ন বাস্তবতাই বেরিয়ে আসত সূর্য কিরণের মত। ‘গল্প হলেও সত্যি’—১৯৬৬ সালের মুভি। পরিচালক তপন সিংহ এটাকে নিয়ে গেছেন কাল্ট ক্ল্যাসিক স্ট্যাটাসে। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মাইলস্টোন হয়ে থাকা এই ছবিটি যদি এখনো না দেখে থাকেন, তবে মিস করেছেন এক কালজয়ী শিল্প।

প্লট : বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের ভেতরটা বড্ড একঘেয়ে। প্রতিদিনের হট্টগোল, উপার্জনের কমতি, ব্যক্তিজীবনের হতাশা—তারই ফাঁকে এক-আধটু প্রেম আর স্বপ্ন দেখার অভ্যেস।

নিরাশার নিস্তরঙ্গ অন্ধকার তবু যেন পিছু ছাড়তে চায় না। কর্মকে ভাবা হয়—জীবন্ত অভিশাপ! পরিবর্তনের অভাব আর উদ্যোগহীনতার শ্রান্তিতে কেটে যায় এক-একটি ব্যর্থ দিন।

একান্নবর্তী একটি পরিবার। নয়জন মানুষের বসবাস। চারজন সমর্থ পুরুষ সেখানে রোজগার করেন। তারপরেও সংসারে অভাব-অভিযোগের শেষ নেই। তিনজন গৃহিণী থাকা সত্ত্বেও রয়েছে একজন কাজের লোক। এ ছাড়া বাপ-মা মরে যাওয়া কৃষ্ণা তো আছেই। ফলে কাজ করার মতো লোকেরও কমতি নেই। তবু নারীদের প্রচন্ড হতাশা আর অভিযোগ। সংসারের কাজ—তাদের কাছে ছিল নাগপাশের মতো। কারণ কাজের চেয়ে, সবার মুখটাই বেশি চলত কীনা..। এরই মাঝে গৃহকর্মী তার কাজে ইস্তফা দিয়ে বসল। ব্যাস, সংসারে নেমে এলো ঘোর অশান্তি। এমনিতেই তাল-লয়হীন পরিবারে পার্সোনালিটি ক্ল্যাশের অভাব নেই। তারই মাঝে এখন আবার কাজের লোকের ঘাটতি। বাকি নারীরা দিনমান শুরু করলেন ঝগড়া আর দোষারোপ করে। মাঝখান থেকে পরিবারের মূল কর্তা যোগেশ চট্টোপাধ্যায়ের শেষ জীবনটা হয়ে উঠল অতিষ্ঠ।

গল্প হলেও সত্যি ছবির দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

এমন ঘনঘোর বিপদেই আশার আলো নিয়ে কোথা থেকে এসে জুটল এক বেঁটে মতো কাজের লোক, মানে—রবি ঘোষ। তিনি নিজেকে পরিচয় দিলেন এভাবে— ‘সংসার শান্তি আশ্রম’ বলে একটি সংঘ থেকে তিনি এসেছেন। তিনি এই পরিবারে কাজ করতে চান। কর্তারা ভাবলেন—এ বাড়িতে যে কাজের চাপ, তাতে এ লোক টিকতেই পারবে না। তাই তাঁরা বিশ টাকা সাধলেন মাস প্রতি। অথচ সবাইকে অবাক করে দিয়ে রবি ঘোষ সংসারের সব কাজ সামলানোর দায়িত্ব নিলেন মাত্র ১২ টাকায়। সবাই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই— কাজ শুরু করলেন রবি ঘোষ! সবার জন্য চা থেকে শুরু করে বাচ্চার দুধ নিমেষে রেডি হয়ে গেল। বাড়ির পিচ্ছিল আঙিনা পরিষ্কার হল দুই মিনিটে। সকালে সবার জন্য কয়েক পদের তরকারীসহ ভাত রান্না হলো। বাবুরা সবাই বহুদিন পর তৃপ্তি করে খেয়ে ছুটলেন যে যার কাজে। নীরব এক প্রশান্তি নামল পরিবারে।

সবার কাপড় ধোয় থেকে শুরু করে, পছন্দ মাফিক রান্না-বান্না আর চা-জল-খাবার সবই তৈরী হতে লাগল কেউ বুঝে ওঠার আগেই। গিন্নীরা কাজহীনতায় শুয়ে-বসে দিন কাটাতে লাগলেন। বাড়ির মেজো ছেলের একমাত্র মেয়ে শৈশবেই যার বাবা-মা মরে গেছে, সেই কৃষ্ণার প্রেমের বিষয়টাও রবি ঘোষ সেট করে দিলেন সুন্দর মতো। বৃদ্ধ যোগেশ চট্টোপাধ্যায়ের সেবা-যত্নের কোনো ত্রুটি থাকল না। মিউজিশিয়ান ভানু ব্যানার্জি কাজ শুরু করলেন মন দিয়ে। বড় খোকার অফিসের বস সন্তুষ্ট হলেন আকস্মিক কর্মোন্নতিতে। টিচার সাজা খোকার মনেও বেশ আনন্দ। অন্যদিকে পরিবারের বড় ছেলে সেও অফিসে নিজের ইন্টেলেকচুয়াল বেসমেন্ট শক্ত করার ইলিমেন্ট পেয়ে গেল রবি ঘোষের কাছ থেকে।

ছবির একটি দৃশ্যে রবি ঘোষ। ছবি: সংগৃহীত

এ যেন জাদু মন্ত্রের মতো এক বিষয়। মধ্যবিত্ত পরিবারে যে কাজ ছিল অভিসম্পাতের বিষয়—তাই হয়ে উঠল আশীর্বাদ। মাত্র কদিনে মহাবিপ্লব সাধন করে, পরিবারের সুখ-শান্তি ফিরিয়ে এনে, রবি ঘোষ ফিরে গেলেন অজানা গন্তব্যে। পরিবারের বুড়ো কর্তা দূর থেকে স্যালুট জানালেন তাকে। কিন্তু কর্মবীর সেদিকে না তাকিয়ে চলে গেলেন নিজের মত করে।

শেষ কথা : হয়তো স্বামী বিবেকানন্দের ‘কর্মযোগ’ থেকেই মুভিটি অনুপ্রাণিত হয়েছে। কিংবা হয়তো মধ্যবিত্ত পরিবারের সংকটগুলো যে আরোপিত, সেটা বোঝাতে পরিচালক তপন সিংহ নিজেই ম্যাজিক্যাল একটা চরিত্র ঢুকিয়ে দারুণভাবে ছবির গল্পটাকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন।

সে যাই হোক—এ ছবি আমাদের মজ্জাগত কর্মবিমুখ প্রবণতা এবং অন্তর্দ্বন্দ্বময় পরিবারগুলোর মূল সমস্যা ও তার সম্ভাব্য সমাধান সুন্দর করে উপস্থাপন করেছে।

সংলাপগুলো পরিমার্জিত, পরিমিত ও বস্তুনিষ্ঠ। অভিনয়ে প্রত্যেকটি চরিত্র ছিল সাবলীল ও সতেজ। সে সময়ের বাস্তবতায় ক্যামেরা ও সিনেমাটোগ্রাফি তো বটেই আপনি ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিককেও শ্রদ্ধাভরে নাম্বার দেবেন। শেষ দৃশ্যে পরিচালক দেখালেন—তাঁর অসম্ভব শক্তিমত্তা। হয়তো রবি ঘোষের প্রস্থান পর্বটি অনেক সংলাপময় বা উপদেশময় হতে পারত। অনেক মাহাত্ম্য আরোপের সুযোগ ছিল। অথচ রবি ঘোষ চলে গেলেন—খুব সাদামাটাভাবে। তার এই গ্ল্যামারবিহীন প্রস্থান যে কতোটা উচ্চমার্গীয়, তা বোঝার জন্য হলেও দেখে ফেলুন—‘গল্প হলেও সত্যি’।






 খুঁজুন