নাম: আনিয়েস ভাগদা
জন্ম: ৩০ মে, ১৯২৮, মৃত্যু: ২৯ মার্চ, ২০১৯
জন্মস্থান: ব্রুসেলস, বেলজিয়াম
পেশা: চলচ্চিত্রকার, আলোকচিত্রশিল্পী ও চিত্রশিল্পী

 

আনিয়েস ভাগদার শেষ সাক্ষাতকার

  সিনেঘর ওয়েব দল

২১ এপ্রিল, ২০১৯

আনিয়েস ভাগদা। বেলজিয়াম বংশোদ্ভুত ফরাসি চলচ্চিত্রকার, আলোকচিত্রশিল্পী ও চিত্রশিল্পী। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ফরাসি নতুন ঢেউ সিনেমার অন্যতম কারিগর তিনি। তাঁকে ফরাসি নতুন ঢেউ ঘরানার সিনেমার গ্রান্ড মাদার বলা হয়। বিশ্বের সব নামকরা চলচ্চিত্র উতসবগুলোতে তাঁর সিনেমা পুরস্কৃত হয়েছে। বাস্তববাদী প্রামাণ্যচিত্র, নীরিক্ষামূলক চলচ্চিত্রের জন্য বিখ্যাত ছিলেন ভাগদা। গত ২৯ মার্চ মারা যান এই কিংবদন্তী। দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা তাঁর শেষ সাক্ষাতকারটি নিয়েছিল। সেটিই বাংলায় অনুবাদ করে দেওয়া হলো পাঠকদের জন্য।


শৈশবে আপনার মজার কোনো স্মৃতি বলবেন?
বাবা–মা আমার নাম রাখেন আগলেত। আমি যখন তরুণ তখন আমার নাম পাল্টে করে দিই আনিয়েস। আমার নামটা ভালো লাগেনি। কারণ ‘এত’ যুক্ত নাম আমার ভালো লাগে না। এই নামগুলো বাচ্চা বাচ্চা লাগে। বাচ্চারা যেমন লাফায় দাপায় এমন লাগে। আমি এমন চটপটে না। তাই আমি আনিয়েস পছন্দ করেছি।

১৯৫০ সাল থেকে একই বাড়িতে আপনি এখনো আছেন? কতটা পাল্টে গেছে বাড়িটা?
যখন আমি এ বাড়িতে আসি, খুব বিরক্ত লাগছিল। টয়লেট ঠিকভাবে বানানো নেই। এমনকি শাওয়ারও নেই। একটু একটু করে আমি এটাকে গড়ে তুলেছি। যখন জ্যাক ভারদা আমার সঙ্গে থাকতে আসে, আমরা এটাকে আরও ভালোভাবে বানাই। এখন এখানে একটি ছোট বাগান আছে। আমাদের তিনটি বিড়াল আছে। মনে হবে যেন একটি প্রাসাদ!


আপনার কাজগুলো করতে কী অনুপ্রেরণা দেয়?
সবকিছু মিলে বাস্তবতা আমাকে খুব বেশি অনুপ্রেরণা দেয়। আমি সাধারণ মানুষদের ওপর প্রচুর ছবি বানিয়েছি।আমার প্রথম সিনেমা লা পয়েন্তে কোর্তে একজন মৎসজীবীকে নিয়ে।যখন আমি দ্য গ্লেনার্স অ্যান্ড আই বানালাম, তখন আমাদের দরকার ছিল সামাজের অপচয় নিয়ে আঙুল তোলা।

আপনাকে নিউ ওয়েভ কিংবদন্তী বললে কেমন অনুভূতি হয়?
‘দ্য গ্রান্ডমাদার অব দ্য নিউ ওয়েভ’ আমার কাছে এটি মজার মনে হয়। কারণ যখন আমার বয়স ৩০ বছর, তখন ত্রুফো দ্য ৪০০ ব্লোজ ও গোদা ব্রেথলেস তৈরি করে ফেলেছে। আর আমি তাদের মাত্র পাঁচ বছর আগে প্রথম সিনেমা লা পয়েন্তে কোর্তে বানালাম। যখন আমি তরুণ তখন মানুষ নিউ ওয়েভ লেখার আবিষ্কার শুরু করে। জেমস জয়েসি, হোমিংওয়ে, ফকনার এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এবং আমি মনে করি, আমরা একটা সিনেমার জন্য স্ট্রাকচার খুঁজে পেয়েছিলাম। আমি র্যাডিক্যাল সিনেমার জন্য যুদ্ধ করেছি। এখনও করছি।

নারীদের গল্প বলা আপনার জন্য কতখানি গুরুত্বপূর্ণ?

সেলো একজন নারী। কিন্তু আপনি জানেন, আমি নারী অধিকারের জন্যই অনেক নারীর সঙ্গে যুদ্ধ করি। আমি নারী অধিকার নিয়ে একটি সিনেমা ওয়ান থিংস, দ্য আদার ডাজন্ট (১৯৭৬), বানিয়েছি। কিন্তু আমি বলতে পারি না যে, ‘আমি জিতে গেছি। এটাই। ’ কারণ নারী অধিকারের সংগ্রাম এখনো চলছে। এটা যে ধীরে ধীরে চলছে তাও ভালো। এখন তাঁরা বলতে পারছে উৎসবগুলোতে যে, বিচারক কমিটিতে অর্ধেক পুরুষ ও অর্ধেক নারী রাখতে হবে। কেন পছন্দ করার অধিকার কেবল পুরুষের থাকবে?


শুনেছি ম্যাডোনা নাকি সেলো তৈরিতে আগ্রহী ছিলেন?
ম্যাডোনা সেলোর গল্পটি জানত। সেলোর গল্প হলো একজন নারীর যে ক্যান্সার চিকিতসার জন্য অপেক্ষা করে। ম্যাডোনা এই গল্পের চিত্রনাট্য লেখার জন্য একজন মেয়েকে প্রস্তাব দিয়েছিল। আমি চিত্রনাট্য লিখে দেব বলে ঠিক করি। কিন্তু তাঁর মায়ের ক্যান্সার হয়েছিল, এবং তিনি মারা যান। তখন ম্যাডোনা কাজটি ছেড়ে দেন। যদি আমি গল্পটি নিয়ে এখন কাজ করি, তাহলে একজন কালো নারীকে নেব, যে এইডস আক্রান্ত। কারণ এইডস আমেরিকাতে ভয়ানক আকার ধারণ করেছে। আমি কাজটি উইটনি হস্টনের সঙ্গে করতে চাই।

আমরা শুনেছি জিম মরিসনের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ ছিল?
আমি তাকে প্রচুর সম্মান করি। জ্যাক (ভাগদার স্বামী) ও আমি ষাটের দশকের দিকে লস অ্যাঞ্জেলেসে তাঁর সঙ্গে দেখা করি। তাকে আমরা তারকা হতে দেখেছি। তিনি সিনেমা নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করতেন। আমাদের সব সিনেমা তাঁর জানা ছিল। ফ্রান্সের প্যারিসে তার শেষকৃত্যে আমরা মাত্র চারজন উপস্থিত ছিলাম। যখন কোনো শিল্পী তাড়াতাড়ি মারা যান, তারা তারকা থেকেও বড় কিছু হয়ে যান।

প্রযুক্তি কীভাবে আপনার চলচ্চিত্র তৈরিতে প্রভাব ফেলেছে?
২০০০ সালের দিকে সবকিছু পাল্টে যেতে শুরু করে। আমিও নিজেকে পাল্টে ফেলতে শুরু করলাম। আমি একটি ছোট ক্যামেরা বের করে ফেললাম। আমি বুঝতে শুরু করলাম যে, আমি নিজেই একা একা চলচ্চিত্র তৈরি করতে পারি। এভাবেই আমি গ্লেনারস অ্যান্ড আই সিনেমাটি তৈরি করি। আমি বিচক্ষণ, কিন্তু আমি পাগলা কাজ কারবারও করতে পারি। ২০০৩ সালে ভেনিস বিয়েনালে আমি আলুর মতো পোশাক পরে এসেছিলাম। আমি এর মাধ্যমে একটা বিষয়ের প্রতি মানুষের মনযোগ ধরতে চেয়েছিলাম। এখন আমি আমার চুলের জন্য মানুষের মনযোগ পাই। আমার চুলের কালার হওয়অ উচিত সাদা, কিন্তু আমি ফ্যান্টাসি তৈরি করে কিছুটা অন্য রঙ করেছি। এভাবে আমি তরুণ হওয়ার চেষ্টা করলাম। আমার নাতি আমাকে `মামিতা পাংক‘ বলত, যখন তারা ছোট। মাঝে মাঝে আমি সোজাসাপ্টাভাবে কাজ না করে অন্যভাবে করি, কারণ আমি যেকোনোভাবেই হোক না কেন আমি মারকুটে স্বভাবের।

ভ্যাগাবন্ড হলো পাংক, কাউন্টারকালচার সিনেমা…
না, এটা পাংক ঘরানার সিনেমা না। এটা রাস্তার কিছু মানুষ নিয়ে করা। সিনেমাটির কেন্দ্রীয় চরিত্র সান্দ্রিন বোনায়া ১৮ বছর বয়সী না। এবং স্বাভাবিকভাবেই সে বিদ্রোহী প্রবণ। আমি খুবই খুশি যে সিনেমাটা বাস্তবসম্মতভাবে তৈরি করা। কারণ এখানে উঠে এসেছে এই বিষয়গুলো। `যখন আপনার কিছু থাকে না, তখন আপনি কী ব্যবহার করেন? আপনি কোথায় যান? আপনার রাগকে কীভাবে আপনি ব্যবহার করেন?‘ ভ্যাগাবন্ড টাকা আয় করেছে। কিন্তু আমার অন্য কোনো সিনেমা কিন্তু সেভাবে টাকা আয় করতে পারেনি।

এই বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
আমি দুঃখিত; আমি যা অনুভব করি তা-ই সিনেমা বানাই। আমি কখনোই কোনো জনপ্রিয় উপন্যাস নিয়ে সিনেমা বানাইনি। খুব কম তারকা নিয়েই সিনেমা বানিয়েছি। একসময় আমি ক্যাথরিন দেনুভকে নিয়ে আমি সিনেমা বানিয়েছিলাম। সেটাই আমার সবচেয়ে বড় ফ্লপ ছবি। সফলতার সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। সিনেমা বানানোর সঙ্গে আমার যোগাযোগ। আমি আমার সম্মানসূচক অস্কার (২০১৭) গ্রহণ করেছি খুবই আনন্দ সহকারে। এটা খুবই মজার যে, হলিউডে আমি এমন একজন চলচ্চিত্রকার যিনি কোনো ব্লকবাস্টার সিনেমা উপহার দিতে পারেননি।


আপনার কাছে সবচেয়ে সেরা উপদেশ কী?
আমার মনে আছে, আমি আলোকচিত্রী বারাসাই এর সঙ্গে দেখা করি। তখন আমি তরুণ আলোকচিত্রী। তিনি বলেছিলেন, `সময় নাও, তাকাও বস্তুর দিকে, তাকাও ভালো করে।‘ আমি এই আইডিয়াটি পছন্দ করি। তুমি কোনো জিনিসের হুবহু ছবি তোল না, তুমি কোনো জিনিসের সেই ছবি তোলো যা তোমার মাথায় আছে।

নিজেকে আপনি কীভাবে দেখতে চান?
আমি নিজেকে একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবে দেখতে চাই। যার একসঙ্গে আনন্দঘন ও কষ্টের জীবন। এটা একদমই ভয়ঙ্কর একটা পৃথিবী, কিন্তু আমি একটা কথা সবসময় মনে রাখি, সেটি হলো, প্রত্যেকটা দিনই যেন মজার হয়। প্রতিদিন আমার জীবনে যা ঘটে, কাজ, মিটিং‘ তা আমাকে মনে করিয়ে দেয়, যে বেঁচে থাকার মূল্য এটাই।

সাক্ষাতকার: পিটার ব্রাডশ
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান




 খুঁজুন