নাম: বং জুন হো
জন্ম: ১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৯
জন্মস্থান: দাইগু, দক্ষিণ কোরিয়া
পেশা: চলচ্চিত্রকার

 

আমি তো পুরাই ফিল্ম পাগলা

  সিনেঘর গল্প বলিয়ে

৩১ মে, ২০১৯

প্রথমবারের মতো দক্ষিণ কোরিয়ায় গেল স্বর্ণপাম। কান চলচ্চিত্র উৎসবের এটিই সবচেয়ে সেরা পুরস্কার। আর এর মধ্য দিয়ে আজীবন দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে লেখা হলো একজন চলচ্চিত্রকারের নাম। তিনি বং জুন হো। ২০০৯ সালে নেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বং বলেছেন তাঁর চলচ্চিত্র জীবন থেকে শুরু করে শৈশব, ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন-সবকিছু। সদ্য স্বর্ণপামজয়ী এই পরিচালকের জীবনের গল্পগুলো শেয়ার করা হলো আজ।

কখন আপনার মনে হলো যে, আপনি সিনেমা বানাতে চান?
এর আসলে কোনো নির্দিষ্ট ক্ষণ কিংবা কারণ নেই। আমি তো পুরাই ফিল্ম পাগলা। আমি সত্তরের দশকের ছেলে। সে সময়ে আমরা ডিভিডি কিংবা ভিসিআর পাইনি। অনেক কারণেই সিনেমা হলে যাইনি। তাই টিভিই ছিল আমার প্রথম সিনেমা হল। আমি টিভিসূচি মুখস্ত রাখতাম। প্রতি সপ্তাহে খোঁজ রাখতাম কোন কোন সিনেমা দেখানো হবে। এই সময়ে আমি মিডল স্কুলে ভর্তি হই। তখন আমি ভেবেছি যে, আমি একজন সিনেমা পরিচালক হব।

আপনার বাবা মা কি সহযোগিতা করত?
কলেজে আমি সমাজবিজ্ঞানে পড়েছি। আমি জানতাম, বাবা মা আমাকে সিনেমায় পড়তে দেবে না। আমি সে সময় কোরিয়ান সেরা পরিচালকদের ঘাটতে শুরু করি। যেমন লি ঝ্যাং-হো ও বি চ্যাং হো। দেখলাম তারা কেউই ফিল্ম স্কুলে পড়েননি। আমি বুঝলাম বড় পরিচালক হওয়ার জন্য ফিল্ম স্কুলে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। কিন্তু স্কুলের ফিল্ম ক্লাবের আমি কড়া সদস্য ছিলাম। স্নাতক শেষ করার পর এক বছরের জন্য কোরিয়ার সরকারি সিনেমা একাডেমিতে পড়ালেখা করি।

কোরিয়ান সমাজে সম্পদ অর্জন ও প্রতিষ্ঠিত হওয়াকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়। চলচ্চিত্রকার হওয়াটাকে কোরিয়ার বাবা-মা কি একটু কঠোরভাবে নেয় না?
আমার ক্ষেত্রে আসলে সত্যিই আমি ভাগ্যবান ছিলাম। কারণ আমার বাবাও আর্টস-এ পড়েছেন। কোরিয়ান একাডেমি থেকে ডিগ্রি নেওয়ার আগ পর্যন্ত আমি বাবা-মাকে জানাইনি যে, আমি কী করতে চলেছি। সৌভাগ্যবশত তাঁরা আমার ভাবনার বিরোধীতা করেনি। কিন্তু তাঁরা বলেছে, তুমি কি ফিল্ম মেকিংয়ের চেয়ে ভাল কিছু করতে পারতে না? (হাসি)। চলচ্চিত্র নির্মাণ করা খুবই রিস্কি, অপ্রতিষ্ঠিত একটি কাজ। সফল হতে হলে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করত। এটা কি টেলিভিশন নাটক শুটিং করার মতো? এখানে কি আয় করার মতো যথেষ্ট সুযোগ আছে? এরকম ছোট-খাট সমস্যা ছিল। বড় ধরনের কোনো বিরোধিতা তারা করেনি। এখন তো আনেক ছেলে মেয়েই অভিনয়ে ক্যারিয়ার করার পরিকল্পনা করছে। আমি মনে করি, বাবা মায়েরা আগের থেকে অনেক সহজ হয়েছে।

অন্য কিছু করতে আপনার আগ্রহ ছিল?
আমি কার্টুনিস্ট কিংবা অ্যানিমেটর হতে চেয়েছিলাম। তবে তা ছিল খুব কম সময়ের জন্য। আমি কখনোই বিনোদনের বাইরের কোনো কিছুতে কাজ করতে আগ্রহী ছিলাম না।


এই সময়ে কোরিয়ার সমসাময়িক চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে আপনি ও পার্ক চ্যান-উক বেশ পরিচিত আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে। কেন আপনি মনে করেন আপনার সিনেমাগুলো আন্তর্জাতিক চাহিদাসম্পন্ন?
আমি যখন সিনেমা বানাই, তখন আমি এটা ভাবি না যে, আমার সিনেমা আন্তর্জাতিক দর্শক কীভাবে নেবে? আমি চরিত্র, গল্প, ও সমসাময়িক অবস্থা নিয়ে ভাবি। আমি কোরিয়াকে ভীষণভাবে উপস্থাপন করি। মেমোরিজ অব মার্ডার সিনেমাটি একদমই কোরিয়ান সিরিয়াল কিলার নিয়ে। দ্য হোস্ট সিনেমাটা হান নদীকে নিয়ে। এটা কোরিয়ার প্রতিদিনকার ঘটনা। একই ঘটনা মাদার সিনেমা নিয়েই।

আমি কখনোই এ কারণে সিনেমা বানাই না যে, আমি আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত হব। আমি সবসময়ই একটা ঘরানার সিনেমাকে ফোকাসে রাখি। কারণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমি এইসব সিনেমাগুলো দেখে বড় হয়েছি। যদিও মেমোরিজ অব মার্ডার ও মাদার খুবই কোরিয়ান সিনেমা। এটাকে ক্রাইম/থ্রিলার ঘরানার মধ্যে ফেলতে পারেন। দ্য হোস্ট মনস্টার ঘরানার বলতে পারেন। এটা আসলে নানা কায়দায় হয়ে থাকে। যেমন ধরুন আমার সিনেমার গল্পগুলো একেবারেই কোরিয়ান। একটা ঘরানায় ফোকাস থাকলে ফিল্মটা দেখতে খুব সহজ হয়। প্রচুর সিনেমা সমালোচক বলেছেন, মাদার হতে পারে হিচকক ঘরানার সিনেমা। আমি মনে করি, এটা হিচককের সিনেমার সঙ্গে মিলতে পারে, আর কিছু না।

টরোন্টো, কান, সান সেবাস্তিয়ান, নিউ ইয়র্ক চলচ্চিত্র উতসবগুলোতে মাদার সিনেমাটিকে দর্শকেরা একটু ভিন্নভাবে গ্রহণ করেছিল?
একটা সিনেমা নিয়ে দর্শকের অভিব্যক্তি সত্যিই খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। আর এই অভিব্যক্তিগুলো সবজায়গায় প্রায় একই হয়। এটা মা ও ছেলেকে নিয়ে সিনেমা। মা ও ছেলের গভীল সম্পর্ক নিয়ে সিনেমাটির গল্প। যা কখনো পরিবর্তন হয় না। যখন এটি সেন সেবাস্তিয়ান ও নিউ ইয়র্ক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়, দর্শকেরা উনের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিল। কিন্তু কোরিয়া ও জাপানে তাঁর অভিনয় কিন্তু ভালোভাবে নেয়নি। সে এশিয়াতে খুবই নামকরা টিভি অভিনেতা। তাই হয়তো তাঁরা তাঁকে এভাবে নিতে পারেনি। যারা কোরিয়া ও জাপানের বাইরের, যারা তাকে চেনে না, তাদের উনের অভিনয় নিয়ে কোনো আগাম ভাবনা ছিল না। যখন কোনো অভিনেতা সম্পর্কে প্রি কনসেপ্ট থাকে না, তখন তাঁকে নৈর্বক্তিকভাবে বিচার করা যায়।

আমিও উন বিনের অভিনয় ভালোবাসি। কীভাবে তাঁকে পছন্দ করলেন?
প্রথমবারে এই চরিত্রের জন্য তাঁকে শক্তিশালী কাস্ট হিসেবে ভাবিনি। আমি ভেবেছি কোরিয়াতে তাঁর ফেইম তাঁর চরিত্রকে ছাপিয়ে যেতে পারে। কিন্তু একজন প্রযোজক, যার সঙ্গে এই ছবির কোনো সম্পর্ক ছিল না, তিনি আমাকে উন বিনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি আমাকে বললেন, টেলিভিশনে উন বিনকে যেভাবে দেখা যায় বাস্তব জীবনে সে খুবই ব্যতিক্রমী জীবন যাপন করে। সে গ্রাম্য এলাকা থেকে এসেছে। উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার আগ পর্যন্ত সে পাহাড়ি এলাকায় থেকেছে। একজন গ্রাম্য বালক হিসেবে তাঁকে তুমি নিতে পার। এবং ও একেবারেই মজার মানুষ। আমি চিত্রনাট্য নিয়ে তখন কাজ করছিলাম। ওর সঙ্গে একদম ঘরোয়াভাবেই দেখা করলাম। আমরা একটা রেস্তোরাঁতে দেখা করি। এবং নিশ্চিত করে বলেছি, আমি তাঁকে দেখে বুঝে ফেলি ছেলে চরিত্রটির জন্য সেই সবচেয়ে উপযুক্ত। তাঁর সঙ্গে কথা বলে এটি আরও নিশ্চিত হই। কারণ সে গ্রাম্য সংস্কৃতি সম্পর্কে একদমই ভালো জানে। তার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তার উপর আমার প্রচুর আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু বলি, উন বিনের চোখ একদমই মনে হলো আমার সিনেমার মায়ের চরিত্র কিম হেই জা এর মতো। তাদের দুজনকে একসঙ্গে আমি ছবি তুললাম। তাদের দেখে মনে হলো তাঁরা সত্যিকারের মা ছেলে। সিনেমার একটি সংলাপ, -দো জোন এর চোখ যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা, যেন হরিণী আঁখি‘-আমি লিখেছিলাম উন বিনকে সিনেমাতে নেওয়ার পরেই।

অনেকেই মনে করেন কিম হেই জা কোরিয়ার জাতীয় মা। কারণ টেলিভিশনে তিনি কয়েক দশক ধরে মায়ের চরিত্র করে এসেছেন। কিন্তু এই সিনেমাতে তাঁর মায়ের চরিত্রটি একেবারেই আলাদা। এটা কি আপনি দর্শককে অবাক করে দিতে করেছিলেন?
এই কারণেই সিনেমাটা এক নম্বরে আসতে পেরেছিল। আমার চিন্তা ছিল, কোরিয়ার জাতীয় মাকে নাও, আর একটা পাগলা সিনেমা বানাও। আমি ভাবলাম, টেলিভিশনে গদবাধা একই মায়ের চরিত্র করতে করতে তিনি এখন ক্লান্ত। যদি তাঁর সামনে এমন একটি গল্প দেওয়া যায়, তিনি বেশ এনজয় করবেন।

কোরিয়ান নাটকে মাকে সবসময়ই একজন কেয়ারিং ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ মা হিসেবে দেখানো হয়। আমার ইচ্ছা ছিল মাকে একটা অন্য জায়গায় গিয়ে দেখাতে। আমি বিশ্বাস করি, খুবই শোচনীয় মুহূর্তে মা তাঁর সন্তানের জন্য যেকোনো কিছুই করতে পারে। এটা খুবই হৃদয়স্পর্শী আবার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ঙ্করও।

আপনার মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন?
খুবই সাধারণ। সুন্দর সম্পর্ক।

আমি একটু মাদার সিনেমার আপনার মায়ের অভিব্যক্তি জানতে চাই। তাঁর অনুভূতি কী ছিল?
কোরিয়াতে উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে মা আসে। তাঁকে এই সিনেমাটা দেখাতে অন্য সিনেমার থেকে বেশি ভয় পেয়েছিলাম। আমি তাঁকে সিনেমার গল্প নিয়ে বলিনি। আমি নিশ্চিত ছিলাম, সে দেখবে আর আশ্চর্য হবে। আমি ভেবেছি, তিনি যা ভাবছেন এটা তার থেকেও ভয়ংকর হবে। সিনেমাটা দেখার পর সে আমাকে বেশি কিছু বলেনি। তাই আমিও তাঁকে কোনো প্রশ্ন করার সাহস পাইনি। আমরা একে অপরকে এড়িয়ে চলেছি। এবং ভেবেছি যে কিছুই ঘটেনি। আমি তাকে সিনেমা নিয়ে তাঁর মতামত জানার চেষ্টা করিনি। আর এটা এমন না যে, আমার নিজের মাকেই আমি পর্দায় মডেল হিসেবে কিম হেই জাকে দেখিয়েছি। তবে হ্যাঁ মায়ের চরিত্রটি তৈরিতে আমার নিজের মায়ের কাছ থেকে যে কিছু নেইনি তা নয়। তবে হ্যাঁ, এটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।

আপনার বাবা আপনার সিনেমা দেখেন?
আমার বাবা মেমোরিজ অব মার্ডার দেখে খুব আনন্দ পেয়েছিলেন। কিন্তু এ নিয়ে কখনো তাঁর সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ হয়নি। আমি মনে করি, তিনি হোস্টও পছন্দ করেছেন। তিনি বার্কিং ডগস নেভার বাইট একদমই পছন্দ করেননি। আমার বাবা একজন অধ্যাপক। আর এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন অধ্যাপককে এভাবে চিত্রায়িত করাটাকে তিনি নিতে পারেননি।

আপনি সবসময় আপনার চিত্রনাট্যগুলো লেখেন। একটা সাধারণ দিন আপনার কীভাবে কাটে?
আমি পাবলিক প্লেসে বসে লিখতে ভালোবাসি। এই যেমন ধরুন, কফি হাউজ। আমি একদমই নিজেকে আলাদা করে বসে লিখেছিলাম, বার্কিং ডগস নেভার বাইট ও মেমোরিজ অব মার্ডার। কিন্তু এটা ছিল এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। আমি যখন লিখি তখন মানুষের শব্দ শুনতে ভালোলাগে। আমি কফি হাউজের এক কর্ণারে গিয়ে বসি। দুই ঘণ্টার মতো লিখি। তারপর আবার হাঁটাহাঁটি করি যতক্ষণ না নতুন কোনো জায়গায় বসি। যেসব কফি হাউজগুলোতে আমি যাই, সেগুলো সাধারণত খুব ভিড়বাট্টা লেগে থাকে না। সিউলে বেশ কয়েকটি কফি হাউজ আছে, যেখানে আমার নিয়মিত যাতায়াত। আমি শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে লিখি। এভাবেই আমি দ্য হোস্ট ও মাদার লিখেছি।

আপনি কি এখন নতুন কোনো চিত্রনাট্য লিখছেন?
আমার নতুন প্রকল্প দুই থেকে তিন বছর আগে ঘোষণা হয়েছে। এর নাম স্নোপিয়েরসার। এটা একটি ফরাসি সাই ফাই গ্রাফিক উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমা। ফরাসি ভাষায় এই নাম উচ্চারণ করাটা আমার কাছে খুবই কঠিন। এটা পৃথিবী শেষ হওয়ার গল্প নিয়ে। একটি ট্রেনে একদল মানুষ একে অপরের সঙ্গে লেগে যায় শ্রেণী বৈষম্য নিয়ে। এটা একদমই কড়া সাই ফাই সিনেমা।


সূত্র: অ্যানথেম ম্যাগাজিনে এই সাক্ষাতকারটি বেরিয়েছিল ২০১৭ সালে ঠিক ওকঝা সিনেমাটি কানে প্রতিযোগিতা বিভাগে মনোনীত হওয়ার পরই। কিন্তু এই সাক্ষাতকারটি নেওয়া হয় ২০০৯ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে। লিখেছেন কি ঝ্যাং।




 খুঁজুন