নাম: মোহাম্মদ রসৌলফ
জন্ম: ১৯৭২
জন্মস্থান: শিরাজ, ইরান
পেশা: চলচ্চিত্রকার

 

আমি চলচ্চিত্র বানাতেই থাকব

  সিনেঘর ওয়েব দল

৫ মার্চ, ২০২০

৭০তম বার্লিন চলচ্চিত্র উতসবে সেরা ছবির পুরস্কার স্বর্ণভাল্লুক জিতেছে ইরানি ছবি দেয়ার ইজ নো ইভিল। গৃহবন্দী নির্মাতা আসতে পারেননি উতসবে। রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণকারী এই পরিচালকের তিনটি ছবি দেখানো হয়েছিল অসলো চলচ্চিত্র উতসবে ২০১৭ সালে। তখনও তিনি সেখানে যেতে পারেননি। তখন তার একটি সাক্ষাতকার নেওয়া হয়। কেমন ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাতা মোহাম্মদ রসৌলফ। তার দর্শন কী? উঠে এল কথাবার্তায়।

আপনার চলচ্চিত্রের রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে কথা বলার আগে অন্য বিষয় নিয়ে একটু জানব। প্রথমে জানতে চাইব, চলচ্চিত্রে আপনার অনুপ্রেরণা কী? যখন আপনি তরুণ স্বাপ্নীক চলচ্চিত্রকার, আপনার আদর্শ কিংবা হিরো কে ছিলেন? বিশ্ব চলচ্চিত্র, বা ইরানি চলচ্চিত্র কিংবা কোনো শিল্প-সাহিত্য থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন? এমন কোনো ছবি, বই কিংবা শিল্পকর্মের কথা বলবেন, যা আপনাকে একজন সৃজনশীল শিল্পী হতে অনুপ্রেরণা দিয়েছে?

আমি খুবই ভাগ্যবান যে, আট বছর বয়সে আমি একটি নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলাম। এই অভিজ্ঞতা আমাকে এরপর বেশ কয়েক বছর তাড়িয়ে বেড়ায়। ১২ বছর বয়সে আমি একটি টেলিভিশন ফিল্মে অভিনয় করি। এবং মঞ্চে অভিনয় ও ক্যামেরার সামনের অভিনয়ের পার্থক্য আমাকে বেশ আন্দোলিত করে। ছোটবেলার চলচ্চিত্র নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে বললে, জাতীয় টেলিভিশনে শৈশবে সিনেমা দেখার কথা বলতে পারি। এই সিনেমা ও সিনেমার গল্প আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। অনেক বছর আগের কথা। ছবিটার নাম আসলে ভুলে গেছি। কিন্তু কয়েক বছর পরে যে ছবিটি আমার সবকিছু এলোমেলো করে দেয়, সেটি হলো বেরনার হের্জগের দ্য এনিগমা অব ক্যাসপার হৌসার। যেটা সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি ছিল।

ম্যান অব ইন্টেগরিটি সিনেমার ‍দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

অসলোর আগের উতসবগুলোতে ইরানের অন্যান্য দারুণসব চলচ্চিত্রকারের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। আব্বাস কিয়ারোস্তামি এসেছিলেন ২০০৬ সালে। তাঁর ছবি এখানের অনেককেই ইরানি ছবি দেখার প্রতি আকৃষ্ট করেছে। একই কথা মোহসেন মাখমালবাফ, আসগর ফরহাদি, জাফর পানাহি এবং আপনার বেলায়ও। ২০১৭ সালে এসে চলচ্চিত্র নির্মাণের ভঙ্গিকে কীভাবে দেখছেন আপনি? আব্বাস কিয়ারোস্তামির মারা যাওয়ার পরে চলচ্চিত্রকার সমাজ তাদের ভবিষ্যতকে কীভাবে দেখছে?

ইরান একটি তরুণ দেশ। মানুষ তাদের জীবনধারা পরিবর্তনের পথ খুঁজছে। তরুণেরা তাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে, নিজেদের বক্তব্যকে বলতে সুযোগ খুঁজছে। গত কয়েক দশকে সিনেমা নির্ভর করছে শেকড়ের ওপর। ইসলামী বিপ্লব এমন একটা অবস্থা তৈরি করেছে যে, কিছু সীমাবদ্ধতা নির্মাতার ওপর চাপিয়ে দিয়েছে, যা নির্মাতার জন্য স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে অনেকেই বাচ্চাদের নিয়ে ছবি তৈরি করার দিকে ঝুঁকেছে, যাতে সেন্সরের মুখোমুখী কম হতে হয়।

এই সেন্সরশীপের ফলে ইরানি সিনেমার একটা আলাদা চেহারা তৈরি হয়। এটা ইরানের বাইরেও আলাদাভাবে গ্রহণ করা হয়। এবং এই সিনেমাগুলোর সফলতা ইরানের বাইরে একটা আলাদা চেহারা তৈরি করে। ইরান সরকার ভেবেছিল, সিনেমা জনপ্রিয় হওয়ার মধ্য দিয়ে আদর্শগুলো বাইরে প্রচারের একটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে তারা বুঝতে পারে যে, প্রভাব ও শাসনের মধ্য দিয়ে সিনেমা নির্মাণ হয় না। যদিও ডিজিটাল বিপ্লব এবং হাতে হাতে ক্যামেরা পৌঁছে যাওয়ার ফলে চলচ্চিত্র নির্মাণ অনেক সহজ হয়ে গেছে। তরুণেরা এখন সমস্ত শক্তি নিয়ে অনুসন্ধানী মনে নিজেদের গল্পগুলো বলার চেষ্টা করছে, একটা নতুন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে।

আপনার চলচ্চিত্র আ ম্যান অব ইন্টেগরিটি কান চলচ্চিত্র উতসবের আ সাঁর্তে রিগা বিভাগে সর্বোচ্চ পুরস্কার পেয়েছে। কান চলচ্চিত্র উতসবে আপনার ছবির প্রদর্শনী থাকেই। এই উতসব আপনার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ? চলচ্চিত্রের জন্য উতসব কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন আপনি?

কান চলচ্চিত্র উতসব যেকোনো নির্মাতার জন্য স্বপ্নের সিঁড়ি। কানে একটি ছবি যাওয়া মানে, এটার পরিবেশনাটা খুব সহজে করা যাবে। নির্মাতা তার পরবর্তী ছবি তৈরির জন্য নির্বিকার থাকতে পারেন। ছোট উতসবগুলো যদিও ফিল্মমেকার ও দর্শকের মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক তৈরি করে। যেমন আমি, যে কিনা তার নিজ দেশেই চলচ্চিত্র দেখাতে পারে না, তার কাছে অসলো ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল উপহারের মতো, যা দর্শক ও নির্মাতাকে যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয়।

কান চলচ্চিত্র উতসবের ফটোকলে ম্যান অব ইন্টেগরিটি সিনেমার অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গে নির্মাতা মোহাম্মদ রসৌলফ (ডান থেকে দ্বিতীয়)। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

আপনি ২০১৪ সালে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে ইরানের মেটাফোরিক্যাল ধারার ছবি নির্মাণের কথা বলেছিলেন। মেটাফোরিক্যালকে ইরানের প্রেক্ষাপটে এক অর্থে সেল্ফ সেন্সরশীপও বলা যায়। আপনাকে কারাগারে পাঠানো শেষে, আপনি কীভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, আপনি এইভাবে সিনেমায় গল্প বলবেন না। আপনি কি মনে করেন যে, রূপক চলচ্চিত্র এখন আপনার কেবলই অতীত? আপনার কি মনে হয়, এই সিদ্ধান্ত আপনার সিনেমায় রাজনৈতিক আদর্শকে আরও পরিস্কার করে বলবে? আপনি কি ভবিষ্যতে আরও কাব্যিক ও দ্বান্দ্বিক ভিজ্যুয়াল স্টাইল নির্মাণ করবেন?

শিল্পীর উপরে সেন্সরশীপ, চাপ এর একটা লম্বা ইতিহাস আছে। এই চাপগুলো রাজনীতি, ধর্ম ও আরও অনেক প্রচলিত কারণে তৈরি হয়েছে। এই চাপের প্রতিক্রিয়া ইরানী শিল্পীরা ইতিহাসের বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিক্রিয়াই প্রকাশ পেয়েছে ইঙ্গিত ও রূপক আকারে। যখন আমি চলচ্চিত্র বানানো শুরু করি, আমি চেয়েছিল আমার গল্প বলার ভঙ্গি থাকবে আমার রাজনৈতিক শেকড়ে গাঁথা।

কিন্তু একই সময় আমি চেয়েছি যেন রাজনৈতিক ক্ষমতার মুখোমুখী না হই। অতএব আমি প্রভাবিত হই ইরানী প্রাচীন সাহিত্য থেকে। আমি রূপক ধারায় চলে আসি। কিন্তু ২০১০ সালে আমি সরকারের সরাসরি মুখোমুখী হয়ে যাই। আমি ও জাফর পানাহি চলচ্চিত্রের শুটিং করা অবস্থায় সেট থেকে আটক হই। এবং আমাদের কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই সরাসরি সংঘর্ষের পরে আমাদের আর রূপক ব্যবহার করার কোনো প্রয়োজনই পড়ে না। যদিও রূপক ভাষা শিল্পে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে। এবং আমি আবার এটি ব্যবহার করব, যা আমি আমার প্রথম দিককার ছবিগুলোতে ব্যবহার করেছি।

৭০তম বার্লিন চলচ্চিত্র উতসবে রসৌলফের সিনেমা দেয়ার ইজ নো ইভিল সিনেমাটি স্বর্ণভাল্লুক পেয়েছে। তিনি ইরান সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে যেতে পারেননি। পুরস্কার হাতে তার মেয়ে বারান। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

তেহরান বিমানবন্দরে আপনার পাসপোর্ট প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ বছর (২০১৭) আপনাকে নতুন করে জটিলতার মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে। তবুও আপনাকে বেশ আশাবাদী মনে হয়। কোনো প্রকার আপোস ছাড়াই কী করে নিজের চলচ্চিত্র নির্মাণে আপনি আবাশাবাদী হন কিংবা অনুপ্রেরণা খুঁজে পান?

আমার অবস্থা জটিল। একদিকে আমি সেন্সরশীপ বিভাগ থেকে চাপে থাকি। অন্যদিকে নিরাপত্তা বিভাগের লোকজন আমার পেছনে লেগেই থাকে। শেষ পর্যন্ত কোর্টে গড়ায়, ছবি তৈরির জন্য শাস্তি পেতে হয়া। এটা আমার জন্য বড় সমস্যা। তবে তার চেয়ে বড় সমস্যা আমার কাছে হলো, পরিবর্তনের জন্য ইরানী সমাজের আশাহত হওয়া ও অবিশ্বাসের বিষয়টি।

কেউ কেউ বলেন, আমার সিনেমাগুলো খুবই শুষ্ক ও হাতশাজনক। কিন্তু এর মধ্যে আশার কথা হলো, এত জটিলতার মধ্যেও আমি চলচ্চিত্র নির্মাণের পথ খুঁজি। যতক্ষণ আমি কোনো না কোনো পন্থা বের করতে পারব চলচ্চিত্র নির্মার্ণের, কোনো ক্যামেরা ব্যবহার করতে পারব, আমি চলচ্চিত্র বানাতেই থাকব।

সাক্ষাতকার: কার্সতেন মেইনিখ, ইংরেজি অনুবাদ: হেরাল্ড ব্রেভিক।
ফিল্মফ্রাসো ম্যাগাজিনে এটি প্রকাশিত হয় ৬ নভেম্বর ২০১৭
মূল সাক্ষাতকার: https://www.filmfrasor.no/en/news/2017/11/Mohammad_Rasoulof.html





 খুঁজুন