সিনে সমাচার

বিদায়, জেমস বন্ড শন কনারি 

  সিনেঘর ওয়েব দল

১ নভেম্বর, ২০২০
প্রথম ও শ্রেষ্ঠ জেমস বন্ড শন কনারি (১৯৩০-২০২০)। ছবি: কোলাজ

জেমস বন্ড হিসেবে রূপালি পর্দায় যাঁকে প্রথম মানুষ দেখল, তিনি শন কনারি। অভিনয় আর দক্ষতা দিয়ে রূপালি পর্দায় অক্ষয় এক চরিত্র আঁকলেন স্কটিশ এই অভিনেতা। গত ৩১ অক্টোর ৯০ বছর বয়সে মারা গেলেন তিনি।

অস্কারজয়ী এই স্কটিশ অভিনেতা বিখ্যাত হয়েছিলেন ষাটের দশকের বনড্ সিরিজের ছবিগুলোর জন্য। পেয়েছিলেন তারকাখ্যাতিও। ইয়ান ফ্লেমিং-এর রোমাঞ্চ উপন্যাসের এই কাল্পনিক ব্রিটিশ স্পাইকে নিয়ে নির্মিত মোট সাতটি থ্রিলার ছবিতে তিনি দেখা দিয়েছিলেন জেমস বন্ড হিসেবে।

তিনি কি সেরা জেমস বন্ড?
চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি অমর এক জেমস বন্ড। কারণ গত ৬০ বছরে কম জেমস বন্ডের ছবি হয়নি। শুধু কনারিই নন এই চরিত্রে আরও দেখা গেছে রজার মুর, জর্জ ল্যাজনবি, টিমোথি ডালটন, পিয়ার্স ব্রসনান এবং সর্বসাম্প্রতিক ড্যানিয়েল ক্রেইগের মতো অভিনেতাদের। বিশেষ করে এই বিংশ শতাব্দিতে তরুণদের কাছে জেমস বন্ড মানেই ড্যানিয়েল ক্রেইগ। তথাপি সকল বন্ডদের মধ্যে শন কনারিকেই নাকি এগিয়ে রাখছেন বন্ড ভক্তরা। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জেমস বন্ড হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন তিনি।

প্রথম ও শ্রেষ্ঠ জেমস বন্ড শন কনারি। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

সিনেমায় তার অবদানের জন্য ২০০০ সালে নাইটহু সম্মানে ভূষিত হন। বেশ কিছুকাল ধরেই অসুস্থ ছিলেন। ছিলেন তিনি বাহামাতে। সেখানেই ঘুমের মধ্যে তার মৃত্যু হয়। চলে যান না ফেরার দেশে।

বন্ড চরিত্রকে প্রথম তিনিই রূপায়ন করেন রূপালি পর্দায়। দ্রুতগামী এ্যাস্টন মার্টিন গাড়ি চালিয়ে ছুটে যান। সঙ্গে থাকে ভদকা মার্টিনি। হাঁটেন যেন তিনি শিকারী কোনো প্যান্থার। মার্জিত পোশাকে শীতল দৃষ্টি। সহজেই হৃদয় হরণ করে ফেলেন সুন্দরী তরুণীদের। তাই তার চারপাশে কখনো সুন্দরী মেয়েদের অভাব হতো না। এই বন্ডই সারা বিশ্বে জনপ্রিয়তা পেয়ে গেল ব্রিটিশ স্পাই হিসেবে।

এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন
ইয়ান ফ্লেমিং এর উপন্যাসে জেমস বন্ড ছিলেন এক অভিজা পরিবারের ছেলে। পড়ালেখাও করেছে অভিজাত স্কুলে। কিন্তু রূপালি পর্দায় এই চরিত্রকে যিনি রূপ দিয়েছেন তাঁর জীবনটা ছিল একদমই সাধারণ। কারখানার এক সাধারণ কর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী মায়ের পরিবারে জন্ম হয় শন কনারির। তখন সালটা ১৯৩০, তারিখটা ২৫ আগস্ট।

বিবিসি বাংলা শন কনারিকে নিয়ে এক প্রতিবেদনে বলেছে, শুরুর দিকে শন কনারির জীবনে প্রাচুর্য, দামি গাড়ি বা সুন্দরী নারী, এসব কিছুই ছিল না। তার বাবা টমি কনারি এক রুমের একটি বাড়িতে বড় হয়েছিলেন। তাতে ছিল না গরম পানি। এমনকি টয়লেট ভাগাভাগি করতে হতো অন্যদের সঙ্গে।


শুরুর দিকে শন কনারির জীবনে প্রাচুর্য, দামি গাড়ি বা সুন্দরী নারী, এসব কিছুই ছিল না। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

১৩ বছর বয়সে স্কুল ছাড়েন শন। তাই জুটিনি কোনো ডিগ্রি। কিছুদিন তিনি বাড়ি বাড়ি দুধ পৌঁছে দেয়ার কাজ করেন। করতেন কফিন পালিশ করা এবং বাড়ি তৈরির ইট পাতার কাজ। এরপরেই শন চলে যান নৌবাহিনীতে। কিন্তু তিন বছরের মধ্যেই তাকে পাকস্থলীর আলসারের জন্য চাকরি ছাড়তে হয়।

সংগ্রমা তারপরও পিছু ছাড়েনি শন কনারির। জীবন নির্বাহের জন্য চালিয়েছেন ট্রাক হয়েছেন এডিনবরার আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীরদের মডেল। তবে অবসর সময়ে বডিবিল্ডিং করতেন, ফুটবলও খেলতেন। একসময় তিনি চেষ্টা করতে থাকেন সিনেমা ও টিভিতে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার।

রূপালি পর্দায় জেমস বণ্ড
পরিচালকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে ঘুরতেই ছোটোখাটো দুই একটা চরিত্র পেয়ে যান। সেগুলো করে খানিকটা পরিচিতও দাঁড়িয়ে গেছে। অবশেষে সৌভাগ্যের দরজা খুলে যায়। ১৯৫৭ সালে তিনি ব্লাড মানি নামে ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান কনারি।

নিজেকে এবার মেলে ধরলেন আরও। একে একে করে ফেলেন বেশ কয়েকটি ছবি। এরপরেই তিনি হাঁটা দিলেন ইতিহাস সৃষ্টি করার পথে। জেমস বণ্ড চরিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রস্তাব পান তিনি।

এ চরিত্রের জন্য তাকে পছন্দ করেছিলেন ডক্টর নো ছবির দুই প্রযোজকের একজনের স্ত্রী। তার মনে হয়েছিল, জেমস বন্ড হবার মতো সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব ও যৌন আবেদন শন কনারির আছে। তবে লেখক ইয়েন ফ্লেমিংয়ের তাকে প্রথমে পছন্দ হয়নি। কিন্তু পর্দায় কনোরিকে দেখার পর মত পাল্টে যায় লেখকের।

সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব ও যৌন আবেদন শন কনারিকে পাইয়ে দিয়েছে জেমস বন্ড চরিত্রটি। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

এদিকে সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা শন কনারিকে অভিজাত হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যাপক কসরত শুরু হয়। তার শুভাকাঙ্খীরা বিভিন্ন সময় শন কনারিকে ভালো ভালো লেখকদের বই পড়তে দিতেন। দামী রেস্তোরাঁ ও ক্যাসিনোতে ঘুরিয়ে তাঁকে সিনেমার চরিত্রের উপযোগী চলন-বলনে অভ্যস্ত করে তুলেছিলেন। এবং তার অভিনীত প্রথম বণ্ড ছবি ডক্টর নো ব্যাপকভাবে ব্যবসাসফল হয়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে শন কনারির নাম।

তবে পরপর পাঁচটি বণ্ড ছবি করার পর শন কনারি নাকি ক্লান্ত এবং বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। ফলে ষষ্ঠ বণ্ড ছবিতে তার জায়গায় আসেন অস্ট্রেলিয়ান অভিনেতা জর্জ ল্যাজেনবি। কিন্তু ছবিটি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ায় প্রযোজকেরা আবার শন কনারিকে ফিরিয়ে আনেন ‘অন হার ম্যাজেস্টি‘জ সিক্রেট সার্ভিস‘ ছবিতে। তার শেষ বণ্ড মুভি ছিল ‘নেভার সে নেভার এগেইন‘।

১৯৮৮ সালে অস্কার মঞ্চে
অভিনেতা হিসেবে ছিলেন অসাধারণ। তার পুরস্কার স্বরূপ ভূষিত হয়েছেন নানা পুরস্কারে। জুটেছে চলচ্চিত্রের অন্যতম পুরস্কার অস্কারও। ১৯৮৮ সালে দি আনটাচেবল ছবিতে এক আইরিশ পুলিশের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য অস্কার পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি দুইবার বাফটা এবং তিনবার গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কারও পেয়েছেন। তার অভিনীত অন্য ছবিগুলোর মধ্যে আছে দি হান্ট ফর রেড অক্টোবর, ইন্ডিয়ানা জোনস, লাস্ট ক্রুসেড, দি রক ইত্যাদি।

অস্কার মঞ্চে পুরস্কার হাতে শন কনারি। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

পারিবারিক জীবনে শন কনারি
শন কনোরির দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী অভিনেত্রী ডায়ান সিলেন্টো, তার ছেলে অভিনেতা জেসন কনোরি। সিলেন্টের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের পর তিনি বিয়ে করেন চিত্রশিল্পী মিশেলিন রোকুব্রুনকে।


স্ত্রী মিশেলিন রোকুব্রুনের সঙ্গে শন কনারি। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

২০০৬ সালে লর্ড অব দ্য রিং ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব পেলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বলেছিলেন, অভিনয়ের ব্যাপারে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। আর হলিউডে এখন যারা ছবি বানায় সেই ‘নির্বোধদের‘ ব্যাপারেও তিনি বিরক্ত।

শন হতে পারতেন ফুটবলারও
স্কটল্যান্ডে জন্ম হবে, কিন্তু ফুটবল ভালোবাসবে না, তা কি হয়? বিখ্যাত এই অভিনেতার বেলায়ও তাই হলো। প্রচন্ড ভালোবাসা ছিল ফুটবলের প্রতি। এমনকি পেশাদার ক্লাবেও খেলেছেন পর্দার এই জেমস বন্ড।

আজীবন নিজেকে ফুটবল-ভক্ত হিসেবে পরিচয় দিয়ে গেছেন সর্বপ্রথম এই জেমস বন্ড। ভালোবাসতেন সেল্টিক ক্লাবকে। শুধু সেল্টিক-রেঞ্জার্স দ্বৈরথই নয়, কনারির মনে ফুটবলপ্রেম বাড়িয়ে দিয়েছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। ফুটবল বেশ ভালোই খেলতেন, সেটা চোখ এড়ায়নি কিংবদন্তি ইউনাইটেড ম্যানেজার স্যার ম্যাট বাসবির। ইউনাইটেডে আনতে চেয়েছিলেন কনারিকে। প্রস্তাব দিয়েছিলেন, প্রতি সপ্তাহে ২৫ পাউন্ড করে আয় করতে পারবেন ইউনাইটেডের হয়ে খেললে। তখন বনিরিগ রোজ নামের এক আধা পেশাদার স্কটিশ ক্লাবের হয়ে খেলতেন কনারি।

অভিনেতা না হয়ে হতে পারতেন ফুটবলারও। ছবি: টুইটার

ফিফাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কনারি নিজেই বলেছিলেন সেই অভিজ্ঞতার কথা, আমি ফুটবল প্রচুর ভালোবাসতাম। ফলে বাসবির প্রস্তাবটা গ্রহণ করতে চেয়েছিলাম। পরে ফুটবলার না হয়ে অভিনেতা হলাম। ভেবে দেখলাম, শীর্ষ পর্যায়ে ফুটবল হয়তো তিরিশ বছর বয়স পর্যন্ত খেলতে পারব, এর পর কী হবে কেউ জানে না। কিন্তু অভিনেতা হলে আরও অনেক বছর খেয়ে-পরে থাকতে পারব। আমার বয়স তখন এমনিতেই তেইশ হয়ে গিয়েছিল (ইউনাইটেডের প্রস্তাব পাওয়ার সময়)। দেখা গেল, এই সিদ্ধান্তটা আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠতম সিদ্ধান্ত ছিল।





 খুঁজুন