সিনে সমাচার

তৃতীয় পার্ট এর ক্লাইম্যাক্স ভাবা আছে 

  সিনেঘর ওয়েব দল

২ মার্চ, ২০২১
দৃশ্যম ছবির পরিচালক জিথু যোসেফ। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

দৃশ্যম-২ এর ট্রেইলার মুক্তির পরেও যে ভয় ছিলো, সিনেমা মুক্তির পর সেই ভয় কেটে হইচই পড়ে গেছে দর্শকের মাঝে। আমাজন প্রাইমে মুক্তি পেলেও এর মাঝেই খরচের ৫ গুণ টাকা তুলে ফেলেছে ছবিটি। এটিও রিমেক হবে হিন্দিসহ বিভিন্ন ভাষায়। দর্শক সমালোচকদের কেউ কেউ বলছেন এটি হচ্ছে উপমহাদেশের সেরা সিক্যুয়াল। আবার কেউ বা এটিকে দেখছেন চিত্রনাট্যকার, পরিচালক জিথু জোসেফের হাতে করা সর্বকালের অন্যতম সেরা থ্রিলার হিসেবে। ক্লাইম্যাক্স নিয়ে দর্শকের উত্তেজনা যখন চরমে সেই সময় ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ সালে ফিল্ম কম্পানিয়নকে দেয়া খোলাখুলি সাক্ষাতকারে জিথু জোসেফ বলেছেন দৃশ্যম ও দৃশ্যম-২ নির্মাণের নানা অজানা গল্প। সিনেঘরের পাঠকদের জন্য পুরো সাক্ষাতকারটি ভাবানুবাদে থাকছে বাংলায়। সাক্ষাতকারটি নিয়েছিলেন ভারতের জাতীয় পুরস্কারজয়ী বিখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক ভরদ্বাজ রঙ্গণ।

রঙ্গণ : আমি আপনার কাছ থেকে প্রথমে এই স্বীকারোক্তিটা চাই, পরিচালক হওয়ার আগে আপনি নিজে ক্রিমিনাল ছিলেন, তাই না? নাহলে আপনি কীভাবে ক্রাইম নিয়ে এভাবে ভাবলেন?
জিথু : (হেসে) না স্যার, চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়ার আগে আমি রাবার গাছ লাগাতাম। আমি একটি কৃষি পরিবার থেকে এসেছি। আমার বাবা এমএলএ ছিলেন। আমি গ্রামের ছেলে; আমার তিন ভাই এবং এক বোন রয়েছে এবং আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে এই শিল্পের সাথে জড়িত।

রঙ্গণ : আপনি তাহলে অপরাধের খুটিনাটি জিনিসগুলো এত গভীরভাবে কীভাবে ভাবলেন?
জিথু: ঠিক জানি না। তবে আমি আগাথা ক্রিস্টির প্রচুর উপন্যাস এবং জেমস হ্যাডলি চেসের অনেক বই, শারলক হোমস এসব পড়েছি…। তাই শৈশব থেকেই রহস্য এবং থ্রিলার ঘরানার মুভিগুলির প্রতি আমার আগ্রহ ছিল।

রঙ্গণ : কখন ভেবেছিলেন যে দৃশ্যমের সিক্যুয়াল হতে পারে?
জিথু: দৃশ্যমের পরপরই সবাই জিজ্ঞেস করছিলো সিক্যুয়াল হবে কি না। আমি বলেছিলাম, না। এটা তো শেষ হয়ে গেছে এবং সিক্যুয়ালের কোনও সুযোগ নেই। আমি এটাকে সিরিয়াসলি নেইওনি। এক দুবছর যেতেই, লোকেরা তাদের নিজের মতো করে গল্প তৈরি করতে শুরু করলো। কেউ হয়তো সিক্যুয়েল নিয়ে ভায়াকমের (প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান) কাছে গিয়েছিলো। ২০১৫ সালের দিকে প্রযোজক অ্যান্টনি পেরুমবাভুর আমাকে বললেন চেষ্টা করে দেখতে। তারপর আমি কি হতে পারে সেসব নিয়ে ভাবতে শুরু করি। এখনকার এই স্ক্রিপ্টে পৌঁছাতে আমার পাঁচ বছর সময় লেগেছে।

রঙ্গণ : আপনি যখন দৃশ্যম লিখছিলেন, তখনই কি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে লাশটি থানার নিচে দাফন করা হবে এবং তারপরে গল্পে এটা পেছন থেকে বিল্ড আপ করবে? কারণ, এটি ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।
জিথু: আমার প্রথম খসড়ায়, ক্লাইম্যাক্সটি থানায় ছিল না। এটি ছিল ছেলেটার কবরের দুইপাশে দাঁড়িয়ে থাকবে দুটি পরিবার। এটি শুধু একটা ভাবনা ছিল, তবে মনে হচ্ছিলো আমি এটা জোর করে করাচ্ছি। তারপর আমি অন্যান্য সম্ভাবনার কথা ভাবলাম। হঠাৎ মাথায় এলো, যদি তা থানার নিচে দাফন হয় তাহলে কেমন হবে? ভেবে দেখি, মজাই হবে। আমি আবার সেই সময়ে আমি জনামাইথ্রি পুলিশ (কেরালার কমিউনিটি পুলিশ) নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করেছিলাম। সেখান থেকে আমি কিছু জিনিস শিখেছি। যেমন, স্টেশনটি যদি খুব পুরোনো হয় তবে কর্তৃপক্ষ এটিকে আবার ভেঙে বানাতে পারে। তাই আমি গল্পটিতে পুলিশ স্টেশনটিকে একটি চরিত্রর মতো বানানোর কথা ভাবলাম। আমি সবসময় মনে করি দর্শকরা আমার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান তাই তারা গল্পে প্রতারিত হন এমন কিছু ভাবিনি। আমি থানা থেকে শুরু করেছি, নায়ককে অভিযুক্ত বানিয়েছি এবং পারিবারিক অংশে কিছু সংশোধন করেছি। দেখবেন দু-তিনটি দৃশ্যে জর্জকুট্টি তার পরিবারকে বলেছে, ‘চিন্তা করো না, আমি তোমাদের জেলে যেতে দেব না।‘ আসলে সে পরোক্ষভাবে বলছে যে ‘পরিস্থিতি যত খারাপই হোক, আমি দোষ ঘাড়ে নিয়ে জেলে যাব।‘ দর্শক এটা দেখেই ভাবতে পেরেছে, ‘ওহ সে কারণেই এখনো বসে আছে, ধরা পড়ার জন্য। ‘

দৃশ্যম পরিবার। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

রঙ্গণ : আপনি যখন সিক্যুয়াল লিখছিলেন, তখন কি এটাকে ফ্যামিলি ড্রামার ধরনের ভেবেছিলেন? মানে, পরিবার কীভাবে এই অপরাধটাকে দেখবে বা এসব মিশ্র অনুভূতিগুলি তাদের মাথায় কিভাবে ঘুরবে সেটা কি ভেবেছিলেন?
জিথু: হ্যাঁ, আমি যখন সিক্যুয়ালটি নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করি তখনই ভেবেছি কোথায় আমি বেশি মনোযোগটা দেব। আমি ২০১৫ সালে কাজ শুরু করেছি। ভেবেছিলাম গল্পের ধারাবাহিকতাটাই ধরে আগাবো, চরিত্রগুলির আলাদা গল্প দিয়ে নয়। যাইহোক, জর্জকুট্টির পরিবার একটি অপরাধ করেছে এবং তারা তো প্রফেশনাল না, স্বাভাবিকভাবেই ট্রমার মাঝে থাকবে। তাই আমি শুরুতে ট্রমা তারপর আরো বিভিন্ন দিক নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছি। এর আগে তো দৃশ্যমের শেষে, তাদের সমাজ বিশ্বাসই করেছে যে জর্জকুট্টি এবং তার পরিবার নির্দোষ এবং সহাদেবন (পুলিশ) তাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করেছে।

এবার কিন্তু এটি অন্যরকম গল্প। কারণ জর্জকুট্টি বেশ ভাল আছে, সে একটি সিনেমা হল কিনেছে। আর পাড়া প্রতিবেশীর কানকথা বলে তো একটা ব্যাপার থাকেই যে - ‘যা রটে তার কিছুটা হলেও ঘটে‘। তাই ধীরে ধীরে তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, ছেলেটার নিখোঁজ হবার বিষয়ে অবশ্যই জর্জকুট্টির পরিবার কিছু না কিছু করেছে। তাই তারা গল্প তৈরি করতে শুরু করে। এটি এরকমভাবে পরিবারে প্রভাব ফেলে যে অনেকে ভাবে, বড় মেয়েটি হয়তো কোন অপরাধ করেছে। মেয়েটার বয়স মাত্র বিশে পড়েছে। এটি তাঁর বিয়ের সময়, ফলে এই সমস্যাগুলি তার থাকতে পারে। পরিবারটিতে দেখবেন, সেখানে চারজন সদস্য এবং প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা ট্রমা আছে। জর্জকুট্টিও ভয় পায় তবে সে তা বাইরে থেকে বুঝতে দেয় না। তার স্ত্রী রানী পুরো অন্ধকারে আছে, সে কিছুই জানে না। পুলিশ যখনই কোথাও খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে, সে নার্ভাস হয়ে যায়। তবে জর্জকুট্টি খুব ঠাণ্ডা মাথার লোক, সে জানে যে কিছুই হবে না। বড় মেয়েটির মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা আছে, খিঁচুনি হয়, দুঃস্বপ্ন দেখে। ছোট মেয়েটি খুব বিরক্ত কারণ তার তো কিছু হবে না। আমি এই সমস্ত জিনিস মাথায় রেখেই কাজ শুরু করি।

আসল চ্যালেঞ্জটা ছিল চরিত্রগুলির আইডেন্টিটিটা বজায় রাখা। এটা ঠিক যে, পাঁচ বছর চলে গেছে আর তার সাথে সাথে চরিত্রগুলির শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন এসেছে। তবে তাদের আইডেন্টিটা ধরে রাখতেই হবে বিশেষত জর্জকুট্টির। সে নিরক্ষর কিন্তু অসাধারণ প্রতিভা আছে। সে একজন যোদ্ধা, অনাথ যে এই পর্যায়ে এসে পৌছেছে। সুতরাং যখন সমস্যা দেখা দিলো, তখন তার কাছে যাই কিছু তথ্য ছিল সেটা দিয়েই সে লড়াই করেছে। সুতরাং তার চরিত্রের এই জিনিসগুলি ধরে রেখেই সিক্যুয়ালে তাকে অসাধারণ কিছু করে দেখাতে হবে। আমি কথা বলতে শুরু করি আমার এক ফরেনসিক সার্জন বন্ধু আর পুলিশে আমার একজন আত্মীয় আছে তাদের সাথে। তারপর আমি সিকুয়েন্সটা সাজাই। স্ক্রিপ্ট শেষ করে আমি ওই ফরেনসিক ডাক্তারের কাছে ওটা নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি, ‘আমি এভাবে ভেবেছি। আপনি যদি ছবিতে এরকমটা দেখেন তাহলে কি বোকা বোকা লাগবে?‘ তিনি আমাকে কিছু সংশোধনে করে বললো,‘ এরকম হতে পারে।

কেউ সকাল ৫ টায় এসে এরকম ঘটনা করতে পারে না, তবে জর্জকুট্টি দুই থেকে তিন বছর ধরে এটির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো এবং ফরেনসিক অফিসে কোনও ক্যামেরা না থাকায় সে সহজেই এটি করতে পারে। থানার নিচে পাওয়া কঙ্কাল বডিটা সিল করার কথা আছে। তারা এটি কার্ডবোর্ড বাক্সে বা বস্তাগুলিতে নিয়ে যায়। কেরালায় এই ধরণের ঘটনা কখনও ঘটেনি, তাই সুযোগ আছে। সিকিউরিটি তার বন্ধুদের সাথে নিয়ে মদ খায়। সুতরাং সবকিছু পুরোপুরি ফিট করা। তারপর আমি ধারণাটা পেলাম এবং ফাইনাল স্ক্রিপ্টে সেটি নিয়ে কাজ করেছি। আমি আমার পরিবারকে বললাম যে আমি তো সিক্যুয়াল করছি। তারা বললো ‘প্লিজ এটা করে তোমার নাম ডুবিও না।‘ তাই আমি তাদের বললাম, ঠিক আছে আমি প্রথম ড্রাফটা দিচ্ছি। পড়ে যদি মনে হয় হবে, তাহলে বাকিটা নিয়ে আগাবো। আমি তাদের আলাদা ঘরে স্ক্রিপ্ট দিয়ে পাঠিয়ে দিলাম যাতে তারা সকলেই একই সাথে স্ক্রিপ্টটি পড়তে পারে।

আমার বড় মেয়ে নিজেও যে সিনেমা বানাতে চায় সে এসে আমাকে বললো, ‘বাবা, এটা ভালো সিনেমা।’ আমি বলেছি, ‘বক্স অফিস কালেকশনের জন্য, আমি দৃশ্যমের মতো ছবি করার চেষ্টা করছি না। আমার উদ্দেশ্য একটি ভাল ছবি তৈরি করা।‘ তো তাদের সবাই এটি পছন্দ করেছে এবং আমাকে এগিয়ে যেতে বলেছে।

আমি আমার এডি‘দের (সহকারী) সাথেও একই কাজ করেছি। তাদের আলাদা ঘরে পাঠানোর আগে জিজ্ঞেস করেছি, ‘ধরো, তুমি দৃশ্যম ২ দেখতে যাচ্ছো। তাহলে হলে ঢোকার আগে তোমার প্রত্যাশা কী!’। তারা তাদের আশার কথাগুলো আমাকে বললো। আমি তাদের বলেছিলাম যে এটি পড়ার পরে বেরিয়ে এসে তোমাদের মতামত আমাকে জানাও। এইভাবে আমি ফিডব্যাক নিয়েছি। তারা ছবির দৈর্ঘ্য আর কিছু লজিকের বিষয় নিয়ে বললো। মোহনলালের কাছে পাঠানোর আগে আমি ওসব সংশোধন করেছিলাম।

রঙ্গণ : জর্জকুট্টির চরিত্রটি বলছে সবকিছুতে সে ভাগ্য বা ঈশ্বরের কারণে বেঁচে গেছে। আপনি আসলেই কোনো ফরেনসিক সার্জনের পরামর্শ নিয়েছিলেন?
জিথু: হ্যাঁ, আমরা সিনেমাতে একশো ভাগ যুক্তি আশা করতে পারি না। সেটা হয় বাস্তব জীবনে। থ্রিলারে বাস্তবতা আর কল্পনা দুটোই থাকবে। তাই আমি এই সিকোয়েন্সগুলিকে একটি বাস্তবসম্মত উপায়ে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি, বাকি যা যোগ করেছি তা ছবিটা আকর্ষণীয় হওয়ার জন্য যাতে মানুষ শেষ পর্যন্ত সিটে বসে থাকে। আমার বিশ্বাস সত্তর ভাগের মতো লজিক্যাল হয়েছে, কিছু সমস্যা থেকে গেছে।

ক্যামেরার পেছনে পরিচালক জিথু যোসেফ। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

রঙ্গণ : কী ধরণের সমস্যা, একটা উদাহরণ দেবেন?
জিথু: (হেসে) আমি আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি, এই সাক্ষাত্কারে না। আমি যখন ফিল্ম বানাচ্ছি, লোকেরা সেখানে লজিক খুঁজছে কেন জানি না। অবশ্যই আমিও তাদের কয়েকটি সিনেমার কথা বলতে পারি যেগুলোতে যুক্তির সমস্যা আছে। অথচ তারা সেগুলো কথা বলছে না। তারা যেটা বলছে তা হলো, ‘আপনার ছবি লজিক্যাল হওয়া উচিত, আমরা লজিকের বিষয়ে ছাড় দেব না।‘

রঙ্গণ : ছবি মুক্তির আগে, আপনি এটাকে ফ্যামিলি ড্রামা বলতে থাকলেন। যখন আমি দেখা শুরু করলাম তখন আমিও ভেবেছি ‘ঠিক আছে, ফ্যামিলি ড্রামা‘ দেখছি। তবে সিনেমায় যখন প্রতিবেশী দুজন পুলিশ হিসাবে বেরিয়ে এলো তখন আমি বুঝলাম ‘ওহ মাই গড, জিথু আবার একই জিনিস করছে ‘। আপনি কি প্রচারের সময় থ্রিলারের এঙ্গেলটা ইচ্ছাকৃতভাবে লুকিয়ে রেখেছিলেন?
জিথু: অবশ্যই, কারণ এটি নিয়ে লোকের প্রত্যাশা খুব বেশি ছিল। আমি একটি ভাল ছবি করার চেষ্টা করেছি। তাই খুব আশঙ্কায় ছিলাম যে খুব উচ্চাশা নিয়ে বসে থাকা দর্শকরা গল্পটিকে পরে প্রেডিক্টেবল বলে ফেলে কি না বা বলবে সিনেমাটা ভাল না। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে চাইনি বিষয়টা আগেই জানুক সবাই।

রঙ্গণ : আপনি দৃশ্যম ২ কেও তাহলে একটি থ্রিলারই বলছেন। আপনি কি কোনো মুহূর্তে অনুভব করেছেন যে আপনি পরিবারের এঙ্গেলটিতে আপোষ করেছেন? কারণ, আপনি রানির চরিত্রটি নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন। চাইলে কি মেয়েদের বিষয়টা আরেকটু লিখতে পারতেন না, যেহেতু এটা ফ্যামিলি এঙ্গেল। আপনি আসলে কীভাবে ভারসাম্যটা রেখেছেন?
জিথু: হ্যাঁ, এটা কঠিন। দর্শকরা বলেছে, ছবির প্রথমার্ধে গল্পটা পিছিয়ে ছিলো। আমি বিশ্বাস করি সিনেমাতে পিছিয়ে থাকাটাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের অবচেতন মনে আসলে আমরা আবেগের জায়গাটা তৈরি করছি। দর্শকরা তখন তা টের পাচ্ছেন না। তারা সবাই আমার কাছ থেকে একটি থ্রিলারের আশা করছেন যাতে তারা পারিবারিক সিকুয়েন্সগুলো দেখতে চান না। তবে পারিবারিক দর্শকের একটা অংশ আবার ওই সিকুয়েন্সগুলো উপভোগ করেছে। যদিও প্রথম অংশে পারিবারিক সিকুয়েন্সগুলোর সময়কাল ছিল এক ঘন্টা-এক-মিনিট এবং দ্বিতীয়ার্ধটি এক ঘন্টা ঊনপঞ্চাশ মিনিট তবুও অনেকে বলেছে এটা ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং সিনেমাটিকে প্রভাবিত করবে। ছবিটি দেখার পরে লোকেরা বেরিয়ে এসে বললো, ‘ফিল্মটি খুব ভাল তবে প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়েছে।’ তবে এই ধরণের পিছিয়ে পড়াটা অবচেতন মনে কাজ করে আমাদের এই দৃশ্যগুলিও দরকার। আমি আসলে মেয়ে এবং রানী চরিত্রের উপর আরও কাজ করতে চেয়েছিলাম, দুটি থেকে তিনটি দৃশ্যে কাজ করেছিলামও। কিন্তু যখন আমি এটি আমার এডিদের দেখালাম তখন তারা আমাকে এটি বাদ দিতে বললো।

রঙ্গণ : আপনি কি এই খসড়া লেখার সময় কখনো জর্জকুট্টিকে অন্তত অন্য বাড়িতে সরানোর কথা ভেবেছিলেন? কারণ প্রথমত, সে তার স্ত্রী মেয়েদের কিছুই বলছে না, গোপন রাখতে চাচ্ছে এই ভেবে যে এটাই নিরাপদ। কিন্তু একই বাড়িতে থাকলে তো আগের ঘটনাগুলো মনে হতেই থাকবে। জর্জকুট্টি কি তাহলে সেই বাড়িতেই থাকবে নাকি চলে যাবে? তা কি আপনি কখনও ভেবেছেন?

জিথু: আসলে শুরুতে আমার এই চিন্তাটা ছিল ওদের সরানোর। কিন্তু তাতে সমস্যা হ‘ল আমরা কিছু জিনিস মিস করব। ধরুন, রানী জানালার সামনে দাঁড়িয়ে যেখানে লাশটি কবর দেওয়া হয়েছে সেখানে তাকিয়ে আছে এবং জর্জকুট্টি বসে ছিলো। এমন সময়ও যেখানে জিজ্ঞাসাবাদ এবং সমস্ত ঘটেছে সে দিকে জর্জকুট্টি তাকাচ্ছে। আমরা এ জাতীয় জিনিস মিস করব এবং এগুলি রেখে সমস্যাগুলো মেলাতে চেষ্টা করেছি।

দৃশ্যম ছবির প্রধান অভিনেতা মোহনলাল। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

রঙ্গণ : আপনি সিনেমাটা শুরু করলেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী হোসে কে দিয়ে। এখানে জর্জকুট্টি এবং হোসের মধ্যে একটি দারুণ পাশাপাশি লজিকের ব্যাপার আছে। তারা দুজনই একটি এক্সিডেন্টাল মার্ডার করেছে এবং তাদের পরিবারের সাথে থাকার চেষ্টা করছে। এটি কি কোনো কাকতালীয় ঘটনা বা ইচ্ছাকৃত ছিল?
জিথু: আমার ধারণার ভিত্তিটা ছিলো কে কতটা মরিয়া তার ওপর। দেখেন জর্জকুট্টি এবং তার পরিবার মরিয়া, পুলিশ বিভাগ এবং মৃত ছেলের বাবা-মা মরিয়া, শেষে আবার হোসেও মরিয়া। তাদের চারজনই স্বার্থপর, তারা কতটা মরিয়া সেটার ওপরই আসলে তাদের মোটিফটা তৈরি হয়েছে। এ কারণেই আমার মনে হয়েছে বিষয়টা আবিষ্কার করা একটি দারুণ দিক। প্রথমে আমার সহকারী পরিচালকরা হোসে ও তার পরিবারের এঙ্গেলটিতে আগ্রহী ছিল না। তবে আমার স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েরা বললো, এটার দরকার আছে। তেলুগু রিমেকের আলোচনার সময়ও বিষয়টা ছিল। আমি মনে করি হোসের পারিবারিক এঙ্গেলটা গল্পটির জন্য জরুরী।

রঙ্গণ : হঠাৎ ঘটনাটা মনে পড়লে হোসে যখন পুলিশের কাছে যায়, তখন সে একবার বললো পুলিশে না এসে তার জর্জকুট্টির কাছে যাওয়া উচিত ছিল, তাতে সে বেশি টাকা পেত। এই দ্বিধাটা কি হোসের বাস্তবেও মনে এসেছিলো?
জিথু: এর আগে এমন একটি দৃশ্য আছে যখন হোসে জর্জিকুট্টির সাথে চায়ের দোকানে দেখা হয়, কিন্তু জর্জকুট্টি তাকে চিনতে পারেনি। তাতে হোসে কিন্তু মনে মনে রাগ করে। এই দৃশ্যটি রাখার কারণ দর্শককে ইঙ্গিত দেওয়া যে হোসে আসলে জর্জকুট্টির ওপর চটে আছে। তাই সে পুলিশের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই দৃশ্যটি না থাকলে হয়তো অনেকে ভাবতে পারে হোসে শুধু শুধু জর্জকুট্টিকে ব্ল্যাকমেল করেছে।

রঙ্গণ : প্রথমার্ধে রানী বলছে যে জর্জকুট্টি গত তিন বছর ধরে স্ক্রিপ্টের কাজ করছে। প্রথম সিনেমার কিন্তু ছয় বছর কেটে গেছে। তাহলে, প্রথম তিন বছরে সে কী করেছে আসলে?
জিথু: জর্জকুট্টি অপেক্ষা করছিলো যতক্ষণ না কবর দেওয়া লাশ কঙ্কালে পরিণত হয়। এটাও প্রশ্ন আসতে পারে, ওই তিন বছরের মধ্যে কেন জর্জকুট্টি ধরা পড়লো না! ঠিক আছে, সেক্ষেত্রে তার জেলেই থাকার কথা। এটা সত্যিই বিরাট ভাগ্য যে জর্জকুট্টি এ পর্যন্ত সময় কাটাতে পেরেছে।

রঙ্গণ : আপনি শুরুতে একটা ব্যাপার রেখেছিলেন পরে যা গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে দেখা দেয়। জর্জকুট্টি এবং রাজন গাড়িতে অ্যালকোহল সেবন করে; রাজন কে এবং কোথায় কাজ করে তা পরে বের হয়েছে। জর্জকুট্টির এই নতুন অভ্যাস কি রাজনের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য নাকি সে নিজেকে শান্ত রাখার জন্য মদ খেত?

জিথু: জর্জকুট্টির অ্যালকোহল সেবনের উদ্দেশ্য রাজনের সাথে বন্ধুত্ব করা। আমার মনে হলো, জর্জকুট্টি এবং রাজনের মধ্যে সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ, সেটা বোঝাতে অ্যালকোহল একটা অনুঘটকের মতো কাজ করেছে।

স্ত্রী ও দুই মেয়ের সঙ্গে জিথু যোসেফ। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

রঙ্গণ : জর্জকুট্টি এমন এক ব্যক্তি যে ছয় বছর ধরে ভয় পেয়ে যাচ্ছে, সে হয়তো ধরা পড়বে। সে তার পরিবারকে বলছে বাড়িতে ওই ঘটনাটা নিয়ে আলাপ না করতে কেননা তাতে বাড়িটি আক্রান্ত হতে পারে, তাই না?
জিথু: জর্জকুট্টি কিন্তু জানতো না যে, তাঁর বাড়িটি এভাবে আক্রান্ত হবে। ওই ঘটনা সম্পর্কে কথা বলতে নিষেধ করার কারণ সে চেয়েছিলো যেন তার পরিবারের সদস্যরা এটি ভুলে যেতে পারে। এই কারণেই সেও কিন্তু অবাক হয়েছে এটা দেখে যে, সরিথার চরিত্রটি একজন ছদ্মবেশী পুলিশ। এমনকি আমি স্ক্রিপ্টটি লেখার সময়ও কখনই ভাবিনি যে জর্জকুট্টি তার প্রতিবেশীদের সন্দেহ করবে।

রঙ্গণ : আপনার চিত্রনাট্য লেখার কোন মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে জর্জকুট্টি একটা সিনেমাহল বানাবে?
জিথু: সিনেমাহল তৈরি করা যে জর্জকুট্টির একটা উচ্চাশা সেটি কিন্তু আমরা প্রথম ছবিতেও দেখিয়েছি। দ্বিতীয়টিতে দেখিয়েছি সে কিছু কৃষিজমি বিক্রি করে এই আশা পূরণ করেছে। হলটি প্রদর্শনের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো আন্ডারকভার কপের ব্যাপারটা পর্দায় আনা।

রঙ্গণ : সিদ্দিক ও মোহনলালের মধ্যে প্রথম কথোপকথনের সময়, আপনি কী ভেবেছিলেন যে এখানে সিদ্দিক একাই থাকবে; আশা শারথের চরিত্রটি থাকবে না?
জিথু: সিদ্দিক যে চরিত্র করেছেন মানে ‘প্রভাকর‘ কিন্তু প্রতিহিংসাপরায়ণ কেউ না। তিনি জর্জকুট্টির কাছে যে অনুরোধটি করেছেন তা সত্য এবং জর্জকুট্টিরও আশা শারথের থেকে সিদ্দিকের উপর আলাদা বিশ্বাসের জায়গা আছে।

রঙ্গণ : আমার শেষ প্রশ্ন, দৃশ্যমের তৃতীয় পার্ট করলে কোথা থেকে শুরু করবেন? কারণ ডেডবডিটা পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। প্রথম পার্টে যখন ভাবলাম সব শেষ আপনি তখন হোসে ক্যারেক্টারটা এনে কাহিনী এগিয়ে নিলেন। এখন আমি ভাবছি তৃতীয়টায় কি করবেন।
জিথু: আমি জানি না তৃতীয় পার্ট করবো কিনা কিন্তু আমার কাছে ওটার ক্লাইম্যাক্সটা ভাবা আছে। আমি মোহনলালকেও ওটা পাঠিয়েছি। তিনিও খুব পছন্দ করেছেন। আমার পরিবারকে বলেছি। আমার মেয়ে জিজ্ঞেস করছে, আমি ওটা করবো কিভাবে। আসলেই ক্লাইম্যাক্স পর্যন্ত যেতে অনেক কিছু করা লাগবে, জানি না কিভাবে। তবে আমি ব্যবসায়িক দিক মাথায় রেখে সিক্যুয়াল প্রিক্যুয়াল এসব করার পক্ষপাতী না। সেটা হলে তিন চার বছর আগেই দৃশ্যম ২ করতে পারতাম। যদি ভাল প্লট পাই তাহলে আগাবো নয়তো না।

রঙ্গণ : ধন্যবাদ জিথু জোসেফ আপনাকে।
জিথু: আপনাকেও স্যার, কথা বলে খুব মজা পেয়েছি।

সাক্ষাতকারটি ভাবানুবাদ করেছেন: মারুফ ইমন, লেখক ও নির্মাতা




 খুঁজুন