অনেকেই মনে করতে পারেন জয়া আহসানের এত প্রশংসার কী আছে! তার মতো অভিনেত্রী ঢের আছে এ দেশে। এমন কিছু তিনি করে ফেলেননি যে তাঁকে নিয়ে আলাদা করে দুকলম লেখা যায়। তাদের বলি, অভিনেত্রী জয়ার কথা বললে আপনার কথার সাথে হয়তো আমি একমত হতাম। কিন্তু এই লেখাটি একজন প্রযোজক জয়াকে নিয়ে। যাকে নিয়ে আলাদাভাবে দুকলম লেখা যায়। কী বলেন?

অভিনেত্রী জয়া আহসানের অতটা ভক্ত আমি নই। কারণ বাংলাদেশের নাটক সম্পর্কে আমার ধারণা কম। খুব অল্প দেখা হয়েছে। তাই নাটকে তার অভিনয় নিয়ে বলা কঠিন। সিনেমাও যে তার খুব একটা দেখেছি এমনটা নয়। তবে যেগুলো দেখেছি তার মধ্যে সবচেয়ে ভালো লেগেছে ডুবসাঁতারের জয়াকে। নুরুল আলম আতিককে আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশের মেধাবী একজন চলচ্চিত্রকার। যার নির্মাণে চলচ্চিত্রের নান্দনিক দিকটা দেখা যায়। কিন্তু ডুবসাঁতার চলচ্চিত্রটা কেন যেন কিছুদূর গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে। একি প্রথম সিনেমার অনভিজ্ঞতায় নাকি বাজেটজনিত কারণে আমার জানা নেই। তবে ওই সিনেমায় যে জয়াকে আমি দেখেছি এখন পর্যন্ত অভিনয়ে ওই জয়াকেই এগিয়ে রাখছি। ওই ছবি ছাড়াও জয়া ভালো পরিচালকের জনপ্রিয় অনেক সিনেমা করেছেন। বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশ মিলিয়েই আর কোনো ছবিতে অত ভালো লাগেনি। তবে হ্যাঁ, ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরীর ভালোবাসার শহর স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিতেও জয়াকে ভালো লেগেছে। সুতরাং অভিনেত্রী হিসেবে জয়া কোনো মাইলফলক নয়।

তবে জয়া একটি কাজে নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য জায়গায়। এটি সম্পূর্ণই আমার মত। এ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। সেটি হলো প্রযোজনা। এর আগে বাংলা সিনেমার কোনো প্রযোজককে দর্শক এত চিনেছে কিনা আমার জানা নেই। যতটা দেবী সিনেমার প্রযোজককে চিনেছে। কারণ আরও অনেক ছবিতে জয়া অভিনয় করেছেন। সেগুলো নিয়ে এত মাতামাতি করতে কখনো তাঁকে দেখা যায়নি। এবার তিনি করলেন। তাঁর কারণ তিনি এই সিনেমার প্রযোজক। বাজারে সিনেমার দর উঠানোর দায়িত্বও যে তাঁর। আসুন প্রথম প্রযোজিত সিনেমার টাইমলাইন ঘেটে বের করি প্রযোজক জয়ার উত্থান ও সফলতা।

প্রথমেই বলে নিই। আমাদের চলচ্চিত্র একটা ইন্ডাস্ট্রি ছিল। সেই ইন্ডাস্ট্রি ভেঙে খান খান। তার নানা কারণ থাকতে পারে। অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি এটাও যে, বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কী করে বাজারে সিনেমা নিয়ে দরদাম করতে হয় সেটা আমরা শিখে উঠতে পারিনি এখনো। আমার এখনো গাজী মাজহারুল ইসলামের আসিতেছে ধরনের প্রচার দিয়েই সিনেমা নিয়ে দরদাম করতে চাই। কী করে প্রযুক্তির শাসনের সময়ে সিনেমার বিকিকিনি করতে হয় সেটা কিন্তু শিখিয়েছেন জয়া। এখানেই তাঁর প্রযোজনার সার্থকতা।

জয়া তো আমাদেরই মেয়ে। সে এটা শিখল কোথা থেকে? এই প্রশ্ন উঠে। তার জন্য চলুন একটু পেছনে চলে যাই। ২০০৪ সালে ব্যাচেলর দিয়ে চলচ্চিত্রের ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। তারপর একে একে ডুবসাঁতার, ফিরে এস বেহুলা, গেরিলা, চোরাবালি সিনেমা করেন। তখনো চলচ্চিত্র জিনসটায় তেমন একটা ধাতস্থ নন তিনি। কেবল অভিনয় করেই খালাস। এরই মধ্যে খবর শুনি কলকাতায় পাড়ি জমাতে চাচ্ছেন তিনি। আবর্ত নামে একটি সিনেমাও করেছেন। অনেকেই তখন নেতিবাচক ইতিবাচক নানা কথা জুড়ে দিয়েছেন জয়ার জীবনে। কিন্তু জয়া থেমে থাকেননি। দুই দেশেই সিনেমা করে গেছেন। করলেন পূর্ণ দৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনি, জিরো ডিগ্রি, পূর্ণ দৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনি ২। তখনো আমরা একজন সিনেমার জয়াকে পাইনি। এরই মাঝে কলকাতার চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি টালিগঞ্জে বেশ পরিবর্তন দেখা যায়। প্রসেনজিত, জিত, তাপস পালদের জনপ্রিয় সিনেমার ঘরানা বাইরে আর্ট ফিল্ম নামে আরেকটি ঘরানা শুরু হয়। যেখানে অনেকগুলো মেধাবী পরিচালকের দেখা মেলে। বাংলা সাহিত্যের নান বিষয় উঠে আসে সেখানে। আমরা পাই সৃজিত মুখার্জি, কৌশিক গাঙ্গুলী, অরিন্দম শীল, অঞ্জন দত্ত, ইন্দ্রনীল চৌধুরীদের। জয়া ভীরে গেলেন সেখানে। তখন সদ্য ইন্ডাস্ট্রিতে আসা সৃজিত নিয়ে বেশ সরগরম সবে। জয়া ওই ঘরানায় করে ফেলেন রাজকাহিনি, ঈগলের চোখ, বিসর্জন, বিজয়া। অনেকেই মনে করেছেন কলকাতার সিনেমায় অভিনয় করা নতুন নয়। আগেও অনেকেই করেছেন। সত্যজিত বাবুর সিনেমাতেই তো অভিনয় করেছিলেন ববিতা। সুতরাং এ আর আহামরি কী। কিন্তু জয়া শুধু অভিনয় করেই ক্ষান্ত হননি। এই সময়ে সিনেমার বিকিকিনিটা শিখে এলেন চুপিচুপি। আর সেটাই কাজে লাগালেন প্রথম প্রযোজিত সিনেমায়।

পাণ্ডুলিপি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দেখুন জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদকেই বেছে নিলেন। তিনি জানেন, এদেশের মধ্যবিত্তের কাছে কতটা জনপ্রিয় তিনি। নিজের প্রযোজনার পাশাপাশি আদায় করে নিয়েছেন সরকারি অনুদানও। এদেশের সরকারি অনুদানের সিনেমার নাম কেউ জানে কিনা সন্দেহ। কোন কোন সিনেমা সরকারি অনুদানে পাওয়া তার নাম বোধহয় উইকিপিডিয়া কিংবা সরকারের তালিকা থেকেই বের করতে হবে। কারণ ওগুলোর নাম কেউ জানেই না। জনগণের টাকার সিনেমা জনগণের চোখের অগোচরেই রয়ে গেল। জয়া এখানে ভিন্ন। সিনেমাটিকে সরকারি অনুদানের সিনেমাগুলো থেকে এক ঝটকায় আলাদা করে ফেললেন। হোক অনুদানের। তাতে কী। সিনেমা নিয়ে চষে বেড়ালেন অন্দরে বাহিরে। জয়া জানেন, পান্ডুলিপির পরে একজন ভালো পরিচালক চাই। তরুণ অনম বিশ্বাসকে বেছে নেওয়া ভুল হয়নি, এ সবাই বলবেন। আয়নাবাজি দিয়ে পরীক্ষিত সৈনিক তিনি। সিনেমা বানানো শেষ করেই অনেকে মনে করেন কাজ শেষ। তাই আমরা সিনেমার প্রযোজককে জেনেছি সিনেমার পেছনের মানুষ হিসেবেই। কিন্তু জয়াকে দেখা গেল সামনের মানুষ হিসেবে। তিনি এগিয়ে এলেন এর প্রচারে। জয়া জানেন, ছবি চালাতে হলে একজন ভালো পরিবেশক দরকার। নেতিবাচক হোক কিংবা ইতিবাচক। এই সময়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শক্তিশালী প্রযোজক ও পরিবেশক জাজ মাল্টিমিডিয়া। জয়া জাজকে দিলেন পরিবেশনার দায়িত্ব। জাজ তার শক্তির জায়গায় সম্পূর্ণ সহযোগিতা করলেন। হয়তো একাকি পরিবেশনা করলে যে হল পেতেন তার দ্বিগুণ পেলেন জয়া। এরপর এলো প্রচার। প্রচার এই সিনেমাকে নিয়ে গেলে অন্য জায়গায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে অনুদানের কোনো সিনেমা নিয় এমন প্রচার হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। কিন্তু জয়া সেটি করলেন। টেলিভিশনে খবর পড়া থেকে শুরু করে টিকিট বিক্রি, কী করেননি তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কাজে লাগিয়েছেন ঠিকঠাক। ফলাফল হলভর্তি দর্শক। এ জন্য প্রচার দলটিও অভিনন্দন পাওয়ার দাবিদার। সিনেমার হাইপ উঠে গেল আকাশচুম্বী।

এই যে একজন অভিনেত্রী জয়া একজন প্রযোজক জয়া হিসেবে অবির্ভূত হলেন, এখন আপনিই বলুন এ নিয়ে কি দুকলম লিখতে হয় না? না লিখলে যে সত্যের অপলাপ হয়। শুধু তাই নয়, সিনেমাওয়ালাদের যে সিনেমাওয়ালাদের পাশে দাঁড়াতে হয়, সে সংস্কৃতিও কিন্তু এখানে শুরু হয়েছে। দহন সিনেমা দেখার পর শুভকামনা জানাতে দেখেছি জয়াকে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেখেছি, দেশের বাইরে দেবী সিনেমার সফলতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন আয়নাবাজি ও ঢাকা অ্যাটাককে। দেশের বাইরে সিনেমা দেখানোর চলনটা ওরা শুরু করেছিল।

সবশেষ একটা কথা বলি। আমাদের অনেক ভুল আছে। কারণ একটা ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে আমরা এখনো ভ্রুণ। তার মাঝে প্রযোজক হিসেবে জয়া যেটি করলেন তাকে সাধুবাদ জানাতে হয়। জানিয়েই দেখুন না। কেমন বদলে যায় সব। এরই মাঝে জয়া ঘোষণা দিয়েছেন পরবর্তী সিনেমার। নাম-ফুরুত। এই সিনেমা নিয়ে কতটুকু এগিয়ে যেতে পারেন তার উপর নির্ভর করছে জয়ার প্রযোজক জীবনের ভবিষ্যত।