চলচ্চিত্র অভিনেতা, প্রযোজক, ব্যবসায়ী ও পরিবেশক—সবার কাছে একটি নাম আতঙ্কের। শুনলেই সবার চোখ খারা। ভারতীয় একটি প্রদেশের নামে নামাঙ্কিত এই প্রতিষ্ঠানের নামই এখন সবার ঘুম হারামের কারণ। যদিও মধ্যবিত্ত সিনেমা হল বিমুখদের জন্য এই প্রতিষ্ঠানটি সবচেয়ে ভালোবাসার কারণ। মুহূর্তেই অনলাইনে এখান থেকে ডাউনলোড করে দেখেন নিতে পারেন সিনেমার পাইরেটেড কপি। আর সিনেমা ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত সঙ্গে সঙ্গেই। বলছি অনলাইনে সিনেমা পাইরেট করে ডাউনলোড করার সুযোগ করে দেওয়া প্রতিষ্ঠান তামিল রকার্সদের কথা। এরা এমনই একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান যারা সিনেমা মুক্তির আগেই এবং মুক্তির দিনে অনলাইনে ডাউনলোড করার সুযোগ করে দেন। প্রযুক্তিতে শক্তিশালী এই দক্ষ প্রযুক্তিবীদদের ধরতে ভারতীয় সরকার প্রচেষ্টা চালালেও হদিস মেলেনি তাদের। বরং তারা আরও শক্তিশালী হয়ে একের পর এক সিনেমা পাইরেট করে আপলোড করে যাচ্ছে। চলুন দেখে আসা যাক তামিল রকার্সদের খুঁটিনাটি।

কী এই তামিল রকার্স?
তামিল রকার্স একটি অনলাইন ওয়েবসাইট। যারা ভারতীয় সিনেমা ও অন্যান্য সিনেমা ডাবিং করে তাদের সাইটে আপলোড করেন। সিনেমা মুক্তির দিন কিংবা তার আগের দিনই তারা এই কাজ করে থাকেন। এটা সিনেমা ব্যবসায়ীদের জন্য দিনদিন সবচেয়ে বড় হুমকী হয়ে আসছে। কিন্তু শিক্ষার্থী, মধ্যবিত্ত চাকুরীজীবি, গৃহিণীরা, যারা ঠিকঠাক সিনেমা দেখতে সিনেমা হলে যেতে পারেন না, তাদের জন্য এটি একটি অসাধারণ লোভনীয় ওয়েবসাইট।

তামিল রকার্স এর পেছনে কারা?

যদিও এ বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট ধারণা নেই যে, কারা এর পেছনে কাজ করছেন। তবে ২০১৮ সালে ১৫ মার্চ ভারতীয় পুলিশ তামিল রকার্স এর একজন মালিক, কর্মকর্তা ও পাঁচজন কর্মীকে গ্রেপ্তার করে। তাদের নাম হলো—প্রভু, জনসন, কার্থি, সুরেশ ও মারিয়া জন। পুলিশের বরাতে বলা হয়, প্রভু তামিল রকার্স এর মালিক। এবং জনসন ডিভিডি রকার্স এর মালিক।

পুলিশ তাদের ধরার পরে সবাই ধারণা করেছিল এটাই তামিল রকার্সদের শেষ পরিণতি। তাদের কবর হয়ে গেছে। কিন্তু কদিন আগেও তাঁরা অনলাইনে ফাঁস করে দিয়েছে ক্যাপ্টেন মার্ভেল সিনেমাটি।

তামিল রকার্সদের সিনেমা ফাঁস করার উদ্দেশ্য কী?

তামিল রকার্সরা কেন অনলাইনে সিনেমা ফাঁস করেন তা জানা যায়নি। কিন্তু এটা বোঝা যায়, যদি কোনো অভিনেতা তাদের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তার বিরুদ্ধে তারা অ্যাকশন নিয়ে থাকেন। তাই কোনো তারকা তাদের বিরুদ্ধে বলার আগে বেশ ভেবেচিন্তে নেন।

তবে তাদের আছে অসাধারণ বিশাল ভক্তদল। টুইটারে মূলত তারা ভক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।কারণ প্রতিনিয়তই তারা সাইটের ঠিকানা পাল্টে ফেলেন। তাই কোন সাইটে সিনেমা পাওয়া যাবে বা তাদের লেটেস্ট আপডেট কী? তা জানার জন্য তারা টুইটারের মাধ্যমে তাদের ঘোষণা প্রকাশ করেন।

অনেক সিনেমা ব্যবসায়ী ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন কোম্পানিকে যুক্ত করেছে তাদের ধরার জন্য। বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে তাদের সাইট ব্লক করার জন্য নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু তামিল রকার্সদের পরিচালনা দল প্রযুক্তিতে খুবই দক্ষ। মুহূর্তে তারা সাইটের এক্সটেনশন পরিবর্তন করে নিজেদের গোপন রাখেন।

উদাহরণস্বরূপ, যখন tamilrockers.com বন্ধ করে দেওয়া হল, তখন তারা tamilrockers.cz নামে নতুন সাইটে চলে এল। এভাবে তারা বিপদ বুঝলেই তাদের সাইট এক্সটেনশন পরিবর্তন করে। ভারতীয় গণমাধ্যমের দেওয়া তথ্য মতে এ পর্যন্ত তারা প্রায় ৩০ বার তাদের এক্সটেনশন পরিবর্তন করেছে।

যখনই তাদের ডোমেন ঠিকানা (সাইট ঠিকানা) পরিবর্তন হয়, তারা টুইটারে সে খবর জানিয়ে দেয়।যখন তামিল সিনেমা কাবালি মুক্তি পায় তখন জনপ্রিয় টরেন্ট সাইট কিকঅ্যাস এর কর্মকর্তা আর্তেম ভাউলিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ কিন্তু তামিল রকার্সরা ছিলেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

এমনকি ডোমেইন সূত্র ধরে তাদের ধরারও চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু তাদের ধরা যায়নি। তার ছিলেন বেনামী। বেনামি এই প্রযুক্তিদক্ষদের নিয়ে বেশ বলা হয়েছে। চলুন এবার দেখা যাক তাদের আয়ের রাস্তা।

তামিল রকার্সদের ব্যবসায়ীক মডেল
অনেকেই জানেন না তামিল রকার্সরা কতভাবে ব্যবসা করেন এই সাইট দিয়ে। একটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সেটি বেরিয়ে এসেছে কিছুটা। যদিও এটির কতটুকু সত্য তা নিশ্চিত নয়। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের আয়ের মূল উৎস পপআপ বিজ্ঞাপন। কিন্তু এটা গুগল অ্যাডসেন্স থেকে পাওয়া নয়। বেশ কতগুলো বিজ্ঞাপনী সংস্থা আছে যারা বিজ্ঞাপনে ক্লিকের উপর ভিত্তি করে তামিল রকার্সদের কাছে পেমেন্ট পাঠায়। কারণ গুগল কখনোই পাইরেটেড কোনো সাইটে বিজ্ঞাপন দেয় না। এরকম কিছু বিজ্ঞাপনী সাইট হলো পপঅ্যাডস, পপমাইঅ্যাডস, প্রপেলার অ্যাডস মিডিয়া, ডায়নামিক অক্সিজেন, এক্সিট জংশন, ব্ল্যাকলেবেলসঅ্যাডস, বাজবিজ। এ ঘরানার বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো প্রাপ্তবয়স্কদের সাইট ও পাইরেটেড সাইটগুলোতে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। যদিও এরাও গুগল অ্যাডসেন্স এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। আপনি তামিল রকার্সদের সাইটে ঢুকলে এসব বিজ্ঞাপনী সংস্থার অ্যাডগুলো দেখতে পাবেন।

কত আয় করে তামিল রকার্স?
সুতরাং এটা পরিস্কার যে, তাদের মূল আয় বিজ্ঞাপন। কিন্ত তাদের আয়ের পরিমাণ কত? বলা হচ্ছে তাদের আয়ের কোনো সীমা নেই। তবে তাদের আয়ের মূল রাস্তাটি হচ্ছে তাদের সাইটের জনপ্রিয়তা। কোনো সিরিয়াল যদি একটানা জনপ্রিয় হতে থাকে তাহলে, সেই কনটেন্টে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আলাদা পরিমাণে টাকা নেওয়া হয়। তামিল রকার্সদের ব্যাপারটিও তাই। সাধারণত পপআপ বিজ্ঞাপনে যে পরিমাণ অর্থ আয় করা হয়, তাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি এমন নয়। তারা তাদের সাইটে বিজ্ঞাপনের জন্য আলাদা সংখ্যার টাকা নিয়ে থাকেন।

কারা দেখেন তামিল রকার্স?
দুই ধরনের ভক্তরা তামিল রকার্স সাইটে ঢুঁ মারেন।
এক. একধরনের দর্শক আছেন যারা খুব সতর্কভাবে সাইটে ঢোকেন। তারা জানেন, বিজ্ঞাপনে ক্লিক করলে তার কোনো উপকার নেই।
দুই. আর কিছু মানুষ আছে যারা অসচেতনভাবে সাইট ব্রাউজ করে। হরহামেশাই বিজ্ঞাপনে ক্লিক করে থাকেন।

এ ছাড়া পাইরেটেড ও প্রাপ্তবয়স্কদের ওয়েবসাইট গুলোর সরাসরি ব্রাউজ করার এসিও স্কোর খুবই কম। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যভাবে ট্রাফিকের মাধ্যমে সাইটে দর্শক ও পাঠক নিয়ে আসেন।

তামিল রকার্সরা কত আয় করে?
যদিও এর সঠিক তথ্য দেওয়া মুশকিল। তবে কিছু কিছু ব্লগার ও ইউটিউবার বিভিন্ন ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের করা পরিসংখ্যান থেকে তামিল রকার্সদের আয় তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে চেক ওয়েবসাইট প্রাইজ, ভলবোট ও ইউআরএল রেট থেকে জানা যায়, তামিল রকার্সদের প্রতিদিনের আয় ১৬২ ডলার থেকে শুরু করে ৪৮৮৪ ডলার পর্যন্ত। যদিও এ নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে।

যেহেতু তাদের আয়ের সূত্র বের করা গেছে, যদিও এটি সঠিক কিনা জানা যায়নি। তথাপি অনেকেই তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোঁজার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাও গোপন রয়ে গেছে। কেউ খুঁজে পাননি। সুতরাং এটা থেকে বোঝা যায়, তারা একটি বিশাল অংকের অর্থ এই সাইটের মাধ্যমে আয় করেন। তবে তার পরিমাণ কত? তা জানা এখনো অসাধ্য রয়ে গেছে।