দেশীয় চলচ্চিত্রে সাপ এসেছে দু’ভাবে- চরিত্র হিসেবে ও মনুষ্যমূর্তি ধারণ করে।
বিশ্ব চলচ্চিত্রে নানাভাবে এসেছে সাপ। একেক সমাজে সাপকে ঘিরে একেক ধারণা বিদ্যমান। সাপ কোথাও যৌনতার প্রতীক, কোথাও সংহারদেবী, কোথাও উদ্ধারকর্তা, কোথাওবা ইচ্ছাপূরণের নিমিত্ত। দেশীয় চলচ্চিত্রে সাপ এসেছে দু’ভাবে- চরিত্র হিসেবে ও মনুষ্যমূর্তি ধারণ করে।
চলচ্চিত্রকে রোমাঞ্চকর করে তুলতে কাহিনির স্বার্থে সাপকে উপস্থাপন করা হয়েছে যুগে যুগে। সাপনির্ভর চলচ্চিত্রের সফলতার পেছনে নারী ও শিশুদের গ্রহণযোগ্যতাই বেশি কাজ করেছে। পরিচালকদের মতে, এই দুই শ্রেণীর দর্শকের কাছে সাপ আকর্ষণীয় বিষয়। এ কারণে একটা সময় পর্যন্ত দেশে একের পর এক ছবি তৈরি হয়েছে সাপকে উপজীব্য করে। এর অধিকাংশই পেয়েছে ব্যবসায়িক সাফল্য।
সাপ ও সাপুড়ে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশে অর্ধশতাধিক চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে।
দেশের অন্যতম সুপারডুপার হিট চলচ্চিত্র ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ (১৯৮৯) সাপ ও বেদে সম্প্রদায়কে নিয়ে অন্যতম ব্যবসাসফল ছবি। এটি তৈরি হয়েছিলো শতবর্ষের প্রাচীন ও গ্রামগঞ্জে বহুল অভিনীত একটি যাত্রাপালা অবলম্বনে। এখানে সাপ ব্যবহৃত হয়েছে বেদেজীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। ছবিটিতে অভিনয়ের মাধ্যমে অঞ্জু ঘোষ রাতারাতি তারকা বনে যান। এপার-ওপার বাংলায় ছবিটি দুর্দান্ত ব্যবসাসফল হয়।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ‘মহুয়া’ (১৯৬৬), ‘বেহুলা’ (১৯৬৬), ‘অরুণ বরুণ কিরণমালা’ (১৯৬৮), ‘পাতালপুরীর রাজকন্যা’ (১৯৬৯), ‘বেদের মেয়ে’ (১৯৬৯), ‘নাগিনীর প্রেম’ (১৯৬৯), ‘মলুয়া’ (১৯৬৯), ‘আমীর সওদাগর’, ‘ভেলুয়া সুন্দরী’ (১৯৭০), ‘নাগ-নাগিনী’ (১৯৭৯), ‘শীষনাগ’ (১৯৭৯), ‘নাগিনী কন্যা’ (১৯৮২), ‘নাগ পূর্ণিমা’ (১৯৮৩), ‘নাগরানী’ (১৯৮৩), ‘পদ্মাবতী’ (১৯৮৪), ‘রসের বাইদানী’ (১৯৮৪), ‘চন্দনদ্বীপের রাজকন্যা’ (১৯৮৪), ‘জিপসি সর্দার’ (১৯৮৪), ‘সতী নাগকন্যা’ (১৯৮৫), ‘নাগমহল’ (১৯৮৬), ‘চাঁদ সওদাগর’ (১৯৮৬), ‘পদ্ম গোখরা’ (১৯৮৭), ‘নাগিনা’ (১৯৮৭), ‘মহুয়া সুন্দরী’ (১৯৮৭), ‘নাগজ্যোতি’ (১৯৮৮), ‘সর্পরানী’ (১৯৮৮), ‘বেহুলা লখিন্দর’ (১৯৮৮), ‘জলপরী’ (১৯৮৯), ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ (১৯৮৯), ‘সাপুড়ে মেয়ে’ (১৯৮৯), ‘সাগরকন্যা’ (১৯৮৯), ‘নাচে নাগিন’ (১৯৯১), ‘রাজার মেয়ে বেদেনী’ (১৯৯১), ‘শীশমহল’ (১৯৯১), ‘বনবাসে বেদের মেয়ে জোসনা’ (১৯৯১), ‘রূপসী নাগিন’ (১৯৯২), ‘নাগিনী সাপিনী’ (১৯৯২), ‘নাগ নাগিনীর স্বপ্ন’(২০০৯) প্রভৃতি।
এসব নাম দেখেই ছবিগুলোর বিষয়বস্তু সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। শ্রেণীভুক্ত করেও চলচ্চিত্রগুলোয় সাপের ভূমিকা নির্ণয় করা যায়। মঙ্গলকাব্য থেকে উৎসারিত ‘বেহুলা’ ও ‘পদ্মাবতী’ ছবি দুটিতে সাপ এসেছে পুরাণের হাত ধরে। উভয় চলচ্চিত্রেই সাপ মর্ত্যের মানুষের ক্ষতি করতে যেমন তৎপর, লোকগাঁথাভিত্তিক ‘মহুয়া’, ‘মলুয়া’, ‘আমীর সওদাগর’ ও ‘ভেলুয়া সুন্দরী’ প্রভৃতি ছবিগুলো আবার লোকজীবনের প্রসঙ্গকে ভিত্তি করে নির্মিত। এগুলোতে লৌকিক মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হিসেবে এসেছে সাপ। ‘পদ্মা গোখরা’য় সাপ এসেছে আধুনিক সাহিত্যকর্মের সূত্রে। এখানে সাপকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ উপাদান হিসেবে দেখেছেন কাজী নজরুল ইসলাম।
বস্তুত বৃহত্তর লোকসমাজের মনের একটি বিশেষ রূপ পাওয়া যায় এসব চলচ্চিত্রে উপস্থাপিত সাপের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো থেকে। সেই বিশেষ রূপটি ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের জয়’ শীর্ষক প্রবচন থেকে উৎসারিত। উল্লিখিত প্রায় সব চলচ্চিত্রেই সাপ দুষ্টের দমনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।