কয়েকবছর আগেও সিনেমার পাগল ছেলেমেয়েদের হার্ডডিস্ক ভরা থাকতো বলিউড, হলিউড, কিছু বাংলা, কিছু তামিল ছবি দিয়ে। এখন সে তালিকায় মালায়লাম কিংবা কোরিয়ান, আবার ব্যাক্তিবিশেষে যোগ হচ্ছে ইরানি, তুরস্ক, ইতালি, ফরাসি, এমনকি থাই ছবিও। সিনেমার যে এই বাউন্ডারি ভেদ করা স্বাদ নেবার সংস্কৃতি তাতে ঘি ঢেলেছে ভারতের দক্ষিণের কেরালার মালায়লাম ছবি। স্বল্পজ্ঞানে দেখাতে চেষ্টা করেছি তার কিছু কারণ।

বলিউডকে একনামে সবাই চিনলেও ‘মলিউড‘ বললে আপনি ভড়কে যেতেই পারেন। কারণ, ভারতের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির প্রায় ৩০ বিলিয়ন রুপির বার্ষিক যোগানদাতা এই মলিউড যে অনেক কারণেই অনেক বছর ধরেই থেকে গেছে আড়ালে। প্রায় ১২০০ সিনেমা হলের পর্দা আর ১০-১২ টির বেশি ভাল ডিস্ট্রিবিউটর নিয়ে সিনেমার জগতে শক্ত আসন গাড়তে মলিউডকে পোড়াতে হয়েছে অনেক কাঠ খড়। তার ফলশ্রুতিতে আজ দুলকার সালমান, নিভিন পাউলি কিংবা সাই পল্লবীদের লাইমলাইটে আসা।

একটু পেছন ফিরে তাকালে দেখি, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারতের ফিল্ম মাথাচাড়া দিলেও মালায়লাম সিনেমার যাত্রা শুরু হয় আরো পরে। প্রথম প্রজেক্টর সমৃদ্ধ হল চালু হয় ১৯০৭ সালে আর সেটা ইলেকট্রনিকাল মেশিনে চালু হতে লেগে যায় আরো ৬ বছর। আর নিজেদের বানানো সিনেমার যাত্রাটা শুরু জে.সি. ডেনিয়েলের হাত ধরে ১৯২৮ সালে নির্বাক ছবি ‘Vigathakumaran’ দিয়ে । সব্যসাচী এই ভদ্রলোক একা হাতে ছবির প্রযোজনা, গল্প, চিত্রনাট্য, পরিচালনা, পরিবেশনা এবং মূল ভুমিকায় অভিনয়ও করেন। পি.কে. রোজী ছিলেন ছবির নায়িকা যাকে মলিউডের প্রথম নায়িকা ভাবা হয়। ডেনিয়েল কেরালায় একটি ফিল্ম স্টুডিও নির্মাণ করেন ছবির উন্নয়নের জন্য। তবে তার সব আশায় গুড়েবালি হয় যখন কেরালার কট্টরপন্থীরা সিনেমায় নারী থাকায় একে পতিতাবৃত্তির সমান বলে প্রচার শুরু করে। ছবিটি ফ্লপ হয় আর শুরুতেই ধাক্কা খায় ইন্ডাস্ট্রি।

এরপর পরের ছবির জন্য অপেক্ষা আরো ৫ বছরের। পরের নির্বাক ছবির নাম ‘Marthandavarma’, এটি নির্মাণ করেন পি.ভি.রাও (সি.ভি. রমণ পিল্লাইয়ের বিখ্যাত ঐতিহাসিক বই থেকে)। আর প্রথম সবাক চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ১৯৩৮ সালে , নোটানি পরিচালিত মেলোড্রামার নাম ‘বালান’। এরপর ধীরে ধীরে এগুতে থাকে ইন্ডাস্ট্রি। পি.জে. চেরিয়া তার ‘নির্মলা’ ছবিতে প্রথম গান ব্যবহার করেন। ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথম সুপারস্টার ধরা হয় Thikkurishi Sukumaran Nair কে তার ১৯৫১ সালের সুপারহিট ছবি ‘Jeevithanouka’র জন্য। সত্তরের দশকে ছবিতে সাদাকালো থেকে রঙিন আসায় নতুন ধারার শুরু হয়, এ সময়কে মালায়লাম ছবির স্বর্ণকাল বলে ধরা হয়, অনেকটা আমাদের আশির দশকের সোনালী দিনের মত। তবে ক্রমেই আর আশি আর নব্বইয়ের দশকে তেমন হালে পানি পাচ্ছিল না ছবিগুলো। পাইরেসি, এডাল্ট বিষয় থাকায় অনেক ভাল কমেডি আর Larger than life গল্পের ছবি নির্মিত হলেও মুখ থুবড়ে পড়ে বছরব্যাপী মুক্তি পাওয়া বাকি ছবিগুলো। এ সময়টা আমাদের মনে করিয়ে দেয় ২০০০ সাল পরবর্তী ‘অশ্লীল যুগ’ এর সময়টাকে।

চলে আসি এ শতাব্দীর কথায়। ২০০০ সাল পরবর্তী মাঝখানের সময়টায় ইন্ড্রাস্ট্রিতে প্রায় একইসময় দারুন কিছু পরিচালকের আগমণ ঘটে মলিউডে। এদের মাঝে আছেন ব্লেসি, রোশান এন্ড্রুজ, আনোয়ার রশিদ। একইসাথে সমন্বয় ঘটে কিছু তারকা অভিনেতা পৃথ্বিরাজ, নারায়ণ, জয়াসুরিয়া, ইন্দ্রজিত,মোহন লাল, মামোত্তি, দীলিপ আর অভিনেত্রী সমুক্তা ভার্মা, কাব্য মাধাবান, মীরা জেসমিন, গীতু মোহনদাস, জ্যোতির্ময়ী, গোপীকা, নব্য নায়ার , নয়নতারা, ভাবনা, পদ্মপ্রিয়া সহ অনেকে। আমরা যেখানে মার খেয়ে গেছি অনেকটাই।

ইদানিং ২০১০ এর পরপর গল্প, সিনেমেটোগ্রাফি আর মিউজিকে এসেছে নতুনত্ব আর জীবনবোধকে নিয়ে আসা হয়েছে লাইমলাইটে। মাত্রা যোগ করছে কিছু সাইকো, থ্রিলার আর মাইথোলজিক্যাল সিনেমাও। কুনচাকো বোবান, আসিফ, পৃথ্বীরাজ, দুলকার সালমান, নিভীন পলির মত অভিনেতারা পুরো ডেডিকেশন দিয়ে উপহার দিচ্ছেন নানা ধাচের ছবি। নায়িকাদের ভেতরে নিতিয়া মেনন, নাজারিয়া নাজিম, মঞ্জু ওয়ারিয়ায়, পার্বতী মেনন,নমিতা প্রমোদ, সাই পল্লবী পাল্লা দিয়ে চলছেন সে পথে। রাজেশ পিল্লাইর মত জনপ্রিয় পরিচালক অকালে মারা গেলেও লাল জোসে, সিদ্দিক, আব্রিদ সিনে, মারটিন প্রাক্কাট নির্মান করে যাচ্ছেন তাদের সেরাটা দিয়ে। তার প্রতিফলন 1983, O Kadhal Kanmani, Ohm Shanti Oshaana, Amar Akbar Anthony, Bangalore Days, Ustad Hotel, North 24 kathaam, Charlie, Premam এরমত ছবিগুলো একদিকে যেমন পাচ্ছে বক্স অফিসে সাফল্য, দর্শকপ্রিয়তা অন্যদিকে হচ্ছে পুরস্কৃত। আর আমরা চোখ জুড়িয়ে দেখছি অজানা দুর্বোধ্য ভাষার সেসব ছবি। গল্পের সমাদর পেয়ে মালায়লাম এখন রিমেক হচ্ছে তামিল, তেলেগু আর বলিউডে দেদারসে।

তামিলে Dindigul Sarathy, Sundara Travels, Seedan, Friends, Ninaithale Inikkum, Perazhagan, Kuselan, Chandramukhi । তেলেগুতে Classmates, Chandralekha, Nagavalli , কান্নাড়াতে Aaptamitra, Manmatha, Bellary Naga আর বলিউডে Garam Masala, Gardish, Kyon Ki, Billu, Bhool Bhulaiyaa, Hera Pheri, Chup Chup Ke, Khatta Meetha, De Dana Dan,Mere Baap Pehle Aap,Dhol, Malamaal Weekly, Bhagam Bhag, Bodyguard, Kyon Ki, Hulchul, Yeh Teraa Ghar Yeh Meraa Ghar কিংবা Drishyam এর মত ছবি রিমেক হয়ে পেয়েছে জনপ্রিয়তাও।