পুরো পরিবারের সবাই খেলার সঙ্গে যুক্ত। দাদা ও বাবা ব্যন্ডমিন্টন খেলেন। বোন খেলেন বেজবল। নিজেও মন দিলেন ব্যাডমিন্টনে। অন্যদের সঙ্গে খুব একটা মিলতে পারতেন না। তাই সকালে ঘুম থেকে উঠা, স্কুলে যাওয়া, ব্যাডমিন্টন প্রশিক্ষণ, পড়া তৈরি, ঘুম পাড়া, এর বাইরে তাঁর জীবনকে চিন্তাও করেননি কখনো। জীবনের একটা সময়ে বিষন্নতা-হাতাশা জাপটে ধরেছিল তাঁকে। বিষন্নতা একজন মানুষকে কতটা নষ্ট করে দেয়, হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন। নিজে তৈরি করলেন প্রতিষ্ঠান ‘দ্য লাইফ লাভ লাফ ফাউন্ডেশন‘। জীবনের একটা বিশাল সময়ে বিষন্নতায় ভোগা এই মানুষটিকে সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বল দেখা গেল সেই সময়ে, যে সময়ে উপমহাদেশের মেয়েরা সবচেয়ে বেশি অশ্রুসিক্ত হয়ে থাকে। সম্প্রতি বিয়ে হলো তাঁর। বিয়ে নিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে হইচই পড়ে যায়। আর তার বিয়ের উচ্ছ্বল হাসি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়তে পৌঁছে গেল যেন আরেকটি বার্তা। দীপিকা পাড়–কোন কি বিয়ের আসরে হাসি দিয়ে উপমহাদেশের পুরনো প্রথা ভেঙে চুরচুর করে দিলেন? যদি তাই হয়, তবে এই হাসি কেবল একজন অভিনেত্রীর হাসি নয়, ভারতীয় উপমহাদেশে নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক শক্তির বহি:প্রকাশ হয়ে রইলো দীপিকার অজ্ঞাতেই।

দীপবীরের বিয়ের অনেক ছবি ভাইরাল হয়েছে ইন্টারনেটে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি সুখের ছিল বিয়ের আসরে দীপিকা আর রনবীরের উচ্ছ্বল হাসির ছবিটি। ভারতীয় উপমহাদেশে বিয়ের আসরে কনের হাসির ছবি খুব একটা দেখা যায় না। দীপিকা নিশ্চয়ই বিয়েতে উচ্ছ্বাস ছড়িয়েছেন। নিজেকে বুঝতেই দেননি জীবনের একটি অনিশ্চিত অধ্যায় শুরু হয়েছে। যদিও দীপিকার বেলায় এই অনিশ্চিত অধ্যায় পরিভাষাটি ঠিক নয়। কারণ অনিশ্চয়তার সকল দরজা তিনি বন্ধ করে দিয়েছেন তাঁর যোগ্যতা দিয়ে। তাই তিনি বিয়ের আসরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবন পরিবর্তনকারী ঘটনায় ছিলেন উচ্ছ্বাসে মাখা। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে এই সত্যি। বিয়ের সংস্কৃতি এমনই, কণে তারা বাবা মাকে চোখের জলে-ই বিদায় জানায়।

একটা ব্যক্তিগত কথা বলি। ছোট বয়স থেকে যত বিয়ে দেখেছি, কখনো দেখেনি বর কেঁদেছে। বরং তাঁরা ছিল সুখী, ফুরফুরে। কিন্তু মেয়েদের দেখেছি কাঁদতে, উচ্ছ্বাসহীন। মেয়টি যতই সুন্দরী, শিক্ষিত, ধনী কিংবা শক্তিশালীই হোক না কেন, বিয়েতে মেয়েদের হাসিখুশি মুখ কখনো দেখা যায়নি। এমনকি সাহিত্য, সিনেমা ও সংগীতেও এর অজ¯্র উদাহরণ মেলে। কণেরা সাধারণত হাসিমুখ থাকতে পারে না। তার কারণ আছে বহু। তবে যেটি আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায় সেটি হলো, এটি একটি নিশ্চিত জীবন থেকে অনিশ্চিত জীবনের দিকে যাত্রা যে। কী হচ্ছে? কী তাঁর পরিণতি, তার সিকিভাগও জানে না মেয়েটি। তার একটি বড় কারণ, এই উপমহাদেশের শতকরা নব্বই ভাগ বিয়ে হয় পরিবারের আয়োজনে। আর তাতে ঘরের পুরুষদের সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়। কণের দায়িত্ব থাকে কেবল সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া। তাই সবার জন্য যে পরিবেশটি আনন্দের হয়ে ওঠে সেটি কন্যার জন্য হয়ে ওঠে বিষাদের। অধিকাংশ সময় কন্যার মতকেও বিবেচনায় আনা হয় না। এমনকি ধর্মীয় সিদ্ধান্তের বাইরে নানা ধরনের সামাজিক প্রথাকে প্রধান্য দেওয়া হয়। দুজন মানুষের সুন্দর জীবনের থেকে প্রথাগুলো হয়ে পড়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর এই সব আয়োজনে যখন গন্ডগোল বাধে দায়টা এসে পড়ে কন্যার ঘাড়েই। কারণ বিয়েটা তার। প্রচলিত আছে, মেয়েদের বিয়ে দেয়, আর ছেলেরা বিয়ে করে। সুতরাং মেয়েটিকে যে সবসময়ই কারো না কারো ঘাড়ে চেপে বসতে হয় এ প্রমাণিত। যদিও ইসলাম ধর্মে মেয়েদের মোহর দেওয়ার প্রচলন আছে। কিন্তু মোহরের বিষয়টিও নির্ধারণ করেন কর্তা পুরুষেরা। সেখানে মেয়ের কোনো অংশগ্রহণ নেই। আর বেশিরভাগ বিয়েরই মোহর পরিশোধ করা হয় না। পুরুষেরা মাফ চেয়ে নেন স্ত্রীর কাছে। এর চেয়ে বড় কৌতুক আর পৃথিবীতে নেই।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই উপমহাদেশে বিয়ের একটি চরম উদ্দেশ্য হলো পরিবারকে দেখা শোনা করা। স্ত্রীকে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যই হলো ঘরের কাজের জন্য। তাঁকে স্বামীকে দেখতে হবে, শ্বশুরকে দেখতে হবে, শ্বাশুড়ীকে দেখতে হবে, দেবরকে দেখতে হবে, আত্মীয় স্বজনকে দেখতে হবে। ঘরের ছেলের কাজটি অদ্ভুতভাবে আরেকজন মেয়েকে দিয়ে করিয়ে নেওয়ার একটা মোক্ষম অস্ত্র এই বিয়ে। অথচ কোনো ক্ষেত্রেই মেয়েটি মানে ঘরের বউটি এই কাজ করার জন্য বাধ্য নয়। কিন্তু কালে কালে এই ধারনাটিই গড়ে উঠেছে বিয়ের একটি প্লট হিসেবে। অথচ কেউ বিয়ের এই দিকটি কখনোই সামনে আনেনি যে, মেয়েটি মূলত তার স্বামীর সঙ্গে একটি যুগল জীবন যাপন করতে এসেছে, কাজের লোক হিসেবে নয়। সুতরাং একটা অদ্ভুত পরিবেশে এসে তাঁকে খাপ খাইয়ে নিতে হবে, সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে, সবার মন মতো চলতে হবে ইত্যাদি। যা বরকে কখনোই করতে হয়নি। এই নিয়তি কেবল কণেকেই সহ্য করতে হয়েছে। এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রপঞ্চই নারীর চোখের অশ্রুর অন্যতম সূত্র। যদিও একটা আবেগি বয়ান দিয়ে নারীর এই অনিশ্চিত যাত্রাটিকে খেলো হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া হয়।

সুতরাং বিয়ের মাধ্যমে নারী যে নতুন একটি জীবনে প্রবেশ করল, সেখানে সুখ আছে স্বাচ্ছন্দ্য আছে, এমনটি নয়। কারণ বিয়ে তাঁর জীবনের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। তাকে কারো উপর নির্ভর করে থাকতেই হচ্ছে। তরুণ বয়সে সে নির্ভর করেছে বাবার উপর। যৌবনে এসেও তাঁকে নির্ভর করতে হচ্ছে স্বামীর ওপর। বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের ওপর। সুতরাং বিয়ের মাধ্যমে নারী বরং অনিশ্চিত আরেকটি নির্ভরতার জায়গায় এসে পড়ে যেখানে তাঁকে মানিয়ে নিতে হবে বৃদ্ধকাল পর্যন্ত। এমনকি একজন নারীর একটি নিজের ঘর পর্যন্ত সারা জীবনে হয় না। এমন অনিশ্চিত জীবনে বিয়ে নারীর জন্য নতুন কিছু বয়ে আনে না। বরং নতুন এক অনিশ্চয়তার দিকে পা বাড়ায়। কারণ বাবা মায়ের সম্পর্ক চির দিনের কিন্তু স্বামীর সম্পর্ক এক সুতায় বাঁধা। ও যেকোনো সময় ছিড়েও যায়।

ভারতীয় উপমহাদেশে নারীর এই যখন দশা তখন দীপিকা পাড়–কোনের বিয়ের ছবিতে হাস্যজ্জ্বল মুখ চিন্তা জাগায় কিছুটা। তার হাসিটি কি উপমহাদেশের বিয়ের শতবর্ষের প্রথাকে একটু হলেও আঘাত করল? নাকি একেবারে চুর চুর করে ভেঙে দিয়েছে? প্রশ্ন জাগে মনে। এই হাসি কি এ বার্তা দেয়? যে, নারীকে অনিশ্চয়তার জীবন বেছে নিতে হয় না। বিয়েতে তাঁরও আনন্দের কিছু ভাগ আছে। কিন্তু কীভাবে পারল বিষন্নতায় ভোগা ওই মেয়েটি? কোথা থেকে এল তার ওই আত্মাবিশ্বাস? এর পেছনের কারণ একটাই। দীপিকা যাকে বিয়ে করেছেন তার কাছে দীপিকা কেবল একটি কণে নন। তিনি একটি মানুষ। যে তাঁর বরের সমান মর্যাদা রাখে। বর রণবীর সিংও এটাই মনে করেন। এতটুকু বিশ্বাস আছে দীপিকার। এই আত্মবিশ্বাস জন্মেছে কোথায়? একটু খুঁজলেই দেখা যাবে তা।

এর পেছনে সবচেয়ে বেশি যেটি কাজ করেছে সেটি হলো শক্তি। সে শক্তি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, মানসিক। দীপিকা আজকে বলিউডের শীর্ষ অভিনেত্রী। নিজের সকল সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছেন। কারও চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য ছিলেন না। যাকে বিয়ে করেছেন তাকেও তিনি চেনেন ভালো করে। তাই অনিশ্চয়তার জীবন তাঁর সামনে আসেনি। সবাই যেন ঘরের মানুষই। তাই তো বিয়ের রীতিও খানিক বদলে দিলেন! সিদুরের টিকা রণবীর যেমন দীপিকাকে দিয়েছেন, দীপিকাও দিয়েছেন রণবীরকে। দুজন আবার ইনস্টাগ্রামেও দিয়েছেন তা। তা-কি কেবল দেখার জন্য? নাকি এই বার্তা দিতে। বিয়েতে কনের কাঁদার দিন শেষ। এবার হাসিমুখ দেখতে চাই।

এই লেখাটি ভারতীয় পত্রিকা দ্য প্রিন্ট এর একটি লেখা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করেছে সিনে ঘর ওয়েব দল।