শিশু মনের উপযোগী চলচ্চিত্রকেই সাধারণভাবে আমরা শিশু চলচ্চিত্র বলে বুঝে থাকি।

শিশু মনের উপযোগী চলচ্চিত্রকেই সাধারণভাবে আমরা শিশু চলচ্চিত্র বলে বুঝে থাকি। এ ধরনের চলচ্চিত্রকে আমরা আবার শিশুতোষ চলচ্চিত্রও বলে থাকি। প্রকৃতপক্ষে শিশুতোষ চলচ্চিত্র দেখে আমরা শিশুদের মনোজগৎ, তাদের চারপাশ, তাদের সমস্যা, বোধ, বিশ্বাস ও বোঝাপড়া সম্পর্কে ধারণা পেয়ে থাকি। তাই শিশুতোষ চলচ্চিত্র সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে ‘শিশু-কিশোর মনঃস্তত্ত্বের বিভিন্ন দিক উপলব্ধি করে তাদের মানসিক বিকাশ এবং নির্মল আনন্দ প্রদানের লক্ষ্যে নির্মিত চলচ্চিত্রকে সাধারণত এই শ্রেণির (শিশুতোষ) অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

বাংলাদেশে কিছু কালজয়ী শিশুতোষ চলচ্চিত্র।

ডুমুরের ফুল সুভাষ দত্ত পরিচালিত বাংলাদেশি বাংলা ভাষার একটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র। এটি সাহিত্যিক আশরাফ সিদ্দিকীর গলির ধারের ছেলেটি নামক গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে। এতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন ববিতা, ইলিয়াস কাঞ্চন, শাকিল, সৈয়দ হাসান ইমাম, সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ। চলচ্চিত্রটি ১৯৭৯ সালে প্রদত্ত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-এ তিনটি বিভাগে পুরস্কার অর্জন করে।

এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী (১৯৮০ )

এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী ১৯৮০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র। জার্মান লেখক এরিখ কাস্টনার রচিত এমিলের গোয়েন্দা দল (১৯২৯) নামক কিশোর গোয়েন্দা উপন্যাসের আলোকে এটি নির্মিত হয়েছে। চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন বাদল রহমান।[১] অভিনয়ে ছিলেন গোলাম মোস্তফা, সারা জাকের, এটিএম শামসুজ্জামান, শর্মিলী আহম্মেদ, মাস্টার পার্থ, শিপলু, টিপটিপ প্রমুখ।

পুরস্কার ১৯৮৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলাদেশী বাংলা ভাষার শিশুতোষ চলচ্চিত্র। সৈয়দ শামসুল হকের কাহিনী, সংলাপ ও চিত্রনাট্যে চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন সি বি জামান। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুমন, শাকিল, বুলবুল আহমেদ, জয়শ্রী কবির প্রমুখ। চলচ্চিত্রটি ১৯৮৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ পাঁচটি পুরস্কার অর্জন করে।[২] জাতীয় পুরস্কার পাবার পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে ভারতের ‘গোয়া চলচ্চিত্র উৎসব‘, ‘দিল্লী আন্তর্জাতিক উৎসব‘ ও রাশিয়ার ‘তাশখান্দ চলচ্চিত্র উৎসব‘-এ প্রদর্শন করা হয়।

ছুটির ঘণ্টা (১৯৮০)

ছুটির ঘন্টা ১৯৮০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি বাংলাদেশী শিশুতোষ চলচ্চিত্র।ছবিটি পরিচালনা করেছেন আজিজুর রহমান। ঈদের ছুটি ঘোষণার দিন স্কুলের বাথরুমে সকলের অজান্তে তালা বন্ধ হয়ে আটকে পড়ে একটি ১২ বছর বয়সের ছাত্র। আর তালা বন্ধ বাথরুমে দীর্ঘ ১১ দিনের ছুটি শেষ হওয়ার প্রতিক্ষার মধ্যে দিয়ে হৃদয় বিদারক নানা ঘটনা ও মুক্তির কল্পনায় ১০ দিন অমানবিক কষ্ট সহ্য করার পর কিভাবে একটি নিষ্পাপ কচি মুখ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে এমনই একটি করূন দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে এই ছবিতে।
ছবির মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছে শিশু শিল্পী সুমন ও অন্যান্য চরিত্রে নায়ক রাজ রাজ্জাক, শাবানা, সুজাতা, শওকত আকবর, এবং এ টি এম শামসুজ্জামান।
দূরত্ব (২০০৪)
দূরত্ব এটি ২০০৪-এর একটি বাংলাদেশী শিশুতোষ চলচ্চিত্র। এটি পরিচালনা করেন মোরশেদুল ইসলাম, ইমপ্রেস টেলিফিল্ম-এর ব্যানারে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করা হয়। চলচ্চিত্রটির প্রধান কয়েকটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন হুমায়ুন ফরীদি, সুবর্ণা মুস্তাফা, রাইসুল ইসলাম আসাদ, হাকিম ফেরদৌস, আখতার হোসেন, দেলোয়ার হোসেন, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, শহিদুল আলম সাচ্চু ও তানিয়া। ছবিটি ২০০৪ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।
পাঠশালা (২০১৮)
মানিকের গল্পের মাধমে সমাজবাস্তবতার রুঢ় সত্য উন্মোচিত হবে। উপলব্ধিতে নাড়া দেবে সমাজের মানুষদের। নির্মাতা চলচ্চিত্রের গল্প সম্পর্কে জানান, একটি ১০বছরের ছেলে মানিক। তার বাবা নেই, মা অসুস্থ্য। এ জন্য তার পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে গেলো। পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে। গ্রামের একজন তাকে ঢাকা গিয়ে কাজের পরামর্শ দেয়।মানিক ঢাকায় চলে আসে। গাড়ির গ্যারেজে কাজ করে। সে যখন গ্যারেজে কাজ করে তার বয়সী ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায়। এ দেখে ব্যাথিত হৃদয়ে মানিক চিন্তা করে পড়াশুনা করবে কিভাবে। এ কারণে সারাদিন কাজ করে নিজে নিজে রাতে বই পড়ার চেষ্টা চালায় সে। একসময় সে সফল হয়। তার সফলতার গল্প বলা হয়। সিনেমায় অভিনয় করেছেন হাবিব আরিন্দা, ইমা আক্তার, ফারহানা মিঠু, তৌফিকুল ইসলাম ইমন, আমিরুল ইসলামসহ অনেকে।
দীপু নাম্বার টু (১৯৯৬)
দীপু নাম্বার টু ১৯৯৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি বাংলাদেশী চলচ্চিত্র।এটি মনন চলচ্চিত্র নিবেদিত রাষ্ট্রীয় অনুদানে নির্মিত চলচ্চিত্র। মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ১৯৮৪ সালের একই নামের কিশোর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন মোরশেদুল ইসলাম। চলচ্চিত্রের নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অরুণ। এছাড়াও বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন বুলবুল আহমেদ, ববিতা, আবুল খায়ের, গোলাম মুস্তাফা, শুভাশীষ এবং আরও অনেকে।
আমার বন্ধু রাশেদ (২০১১)
আমার বন্ধু রাশেদ ২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি বাংলাদেশী যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। মুহম্মদ জাফর ইকবাল রচিত একই নামের শিশুতোষ উপন্যাস অবলম্বনে বাংলাদেশ সরকারের অনুদানে চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন মোরশেদুল ইসলাম।চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেছে মমন চলচ্চিত্র ও ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। এই চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয়ে করেছেন চৌধুরী জাওয়াতা আফনান, অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়, ইনামুল হক, হুমায়রা হিমু, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, আরমান পারভেজ মুরাদ, এছাড়াও শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেছেন রায়ান ইবতেশাম চৌধুরী, কাজী রায়হান রাব্বি, লিখন রাহি, ফাইয়াজ বিন জিয়া, রাফায়েত জিন্নাত কাওসার আবেদীন।১৯৭১ সালে মফস্বল শহরের কয়েকজন কিশোর কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তারই কিছু চিত্র ফুঁটে উঠেছে গল্পে।
আঁখি ও তার বন্ধুরা (২০১৭)
এটি নির্মিত হয়েছে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘আঁখি এবং আমরা কজন‘ অবলম্বনে। মনন চলচ্চিত্র ও ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড প্রযোজিত ‘আঁখি ও তার বন্ধুরা‘ ুনির্মিত হয়েছে সরকারী অনুদানে। ছবির নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন শিশুশিল্পী জাহিন নাওয়ার হক ইশা। এছাড়াও অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছন সুর্বণা মুস্তাফা, তারিক আনাম খান, আল মনসুরসহ অনেকে।