১৮৯৫ সাল। ২৮ ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় ফ্রান্সের প্যারিসে লো সালু আইঞ্জে দু গ্রান্ড ক্যাফেতে এক ভোজবাজির মুখোমুখী ফরাসী দর্শক। আলোকচিত্রে দেখে আসা এতদিনের স্থির মানুষগুলো কেমন হেঁটে বেড়ালো চোখের সামনে। বিস্ময়ে-কৌতুহলে অবাক তাঁরা। সৃষ্টি হলো নতুন ইতিহাস। লুমিয়ের ব্রাদ্রার্স নামে পরিচিত ভাইয়েরা পকেট থেকে যাদুর লাঠি বের করে চোখ ছানাবড়া করে দিলেন। যাত্রা শুরু হলো চলচ্চিত্র নামের নতুন এক শিল্পের। শতবর্ষ পেরিয়ে আজও শিল্প সৃষ্টির সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে শাসন করছে বর্তমান বিশ্বকে।

প্রবন্ধের শিরোনাম স্বল্প দৈর্ঘ্য হলেও চলচ্চিত্রের ইতিহাস টানার তাৎপয র্কী? এমন প্রশ্ন খলবলিয়ে উঠতে পারে। তাঁদের বলি, ইতিহাসের শুরুটা হয়েছিল লুমিয়ের ভাইদের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দিয়েই। তাই এই শীবের গীত। শুধু চলচ্চিত্র ইতিহাসের গোড়ার কথাই নয়, বাংলাদেশে স্বাধীনতা পরবর্তী যে চলচ্চিত্র আন্দোলনের শুরু হয়েছিল, তাও ছিল স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দিয়ে।

ভারতীয় উপমহাদেশে ১৯০১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ হীরালাল সেনের হাতে চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু। সে সময় অবিভক্ত বাংলার সরলা, ভ্রমর, আলিবাবা, হরিরাজ, দোললীলা, বুদ্ধ সীতারাম ইত্যাদি চলচ্চিত্রগুলোও স্বল্পদৈর্ঘ্য। ১৯১৩ সাল পর্যন্ত উপমহাদেশের সব চলচ্চিত্রই স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছিল।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ধারার সিনেমার উল্টো পিঠে চলচ্চিত্র আন্দোলনে তৈরি শুরুর দিকের চলচ্চিত্রগুলোও স্বল্পদৈর্ঘ্যের। আন্দোলনের প্রথম ফসল হিসেবে দেখি আগামী, হুলিয়া, আদম সুরতর মতো চলচ্চিত্র। তৈরি হয় চাক্কি, প্রত্যাবর্তন, ঢাকা টোকাই, অরণ্য, ছুটির মতো স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি। চলচ্চিত্রের গোড়ার কথা বললে স্টপ জেনোসাইড ভাস্বর হয়ে আছে উজ্জ্বল তারকা হয়ে সার্থক স্বল্পদৈর্ঘ্য হিসেবে।

দুনিয়া জুড়ে স্বল্পদৈর্ঘ্যরে ইতিহাসটা এমনই। কিন্তু এই সময়ে এসে শোনা যায় একটি কদাকার কথা। কথাটি অনেকেই গায়ে না মাখলেও ভবিষ্যতে এ দেশের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এটি হয়ে উঠতে পারে ভয়ঙ্কর হয়ে। প্রযুক্তির উন্নতিতে চলচ্চিত্র ধারণে খুবই সহজ উপায় ডিজিটাল ক্যামেরা। রিলের কোনো বালাই নাই। সেই সুযোগে তরুণেরা হাতে একটি ক্যামেরা নিয়ে কয়েকটি ভিডিও করে ফেলছেন। সেটি হয়ে যাচ্ছে স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি। এমনকি টেলিভিশনের জন্য তৈরি নাটকের শুটিংয়ের ফাঁকে, সেই নায়ক নায়িকাদের দিয়ে কয়েকটি দৃশ্য শুটিং করে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে স্বল্পদৈর্ঘ্য নামে। কখনো কখনো মিউজিক ভিডিওর মতো একটা ছেলে আর একটা মেয়ের আবোল তাবোল দৌড়া-দৌড়ি ভিডিও করে মিউজিক্যাল স্বল্পদৈর্ঘ্য বলা হচ্ছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় ভয়ঙ্কর কা- ঘটছে। এসব চলচ্চিত্রকারদের ধারণাÑস্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানানো হয় হাত পাকাতে। এমন আবোল তাবোল বানিয়ে হাত পাকালেই কেবল পূর্ণদৈর্ঘ্যে হাত দেওয়া যাবে। অর্থাৎ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানানোর আগে হাত পাকাতে স্বল্পদৈর্ঘ্য বানাওÑতা আগডুম বাগডুম যাই হোক।

বর্তমান সময়ে তাই বাংলাদেশী শয়ে শয়ে চলচ্চিত্রকার দেখা যায়। তাঁরা কেউ শখের বশে, কেউ ফেইসবুকে দিতে, কেউ ইউটিউবে নিজের একটি চ্যানেল করে টাকা আয়ের ধান্দায় করছেন এসব। আবার কেউ টেলিভিশন নাটকের মন্দা সময়ে প্রযোজক না পেয়ে স¦ল্প টাকায় তৈরি করছেন এসব। আবার দেখা গেল, কোনো বহুজাতিক কোম্পানী তাঁদের প্রচারে আয়োজন করল স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রতিযোগিতা। সেখানে মাথায় ভুত চাপা তরুণ চলচ্চিত্র কর্মী বানিয়ে ফেলছেন চলচ্চিত্র। আদতে সেটি চলচ্চিত্র নাকি তাঁর পণ্যের প্রমোশন তৈরি করা হলো, তা বিবেচনা করার তাগিদটুকুও নেই। এমনই দশা আমাদের আজকের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের।

অনেকে মনে করতে পারেন, শিল্প সৃষ্টির কোনো ব্যাকরণ নেই। আগে শিল্প, পরে তাঁর ব্যাকরণ রচিত হয়েছে। সে কথা বলতেই পারেন। কিন্তু আপনি যদি আম আঁকতে গিয়ে কাঠাল এঁকে ফেলেন তবে বোধ হয় ভাবার কিছু আছে। কারণ এই ক্ষণে দেশের চলচ্চিত্র বয়ঃসন্ধিকালীন সময় পার করছে। এই সময়ে চলচ্চিত্রের ধারণা ভুল ¯্রােতে হারিয়ে গেলে, ভবিষ্যতে চলচ্চিত্রের জন্য তা হবে সত্যিই ভয়াবহ।

একটা সময় বাঙালি মধ্যবিত্ত চলচ্চিত্র মনস্ক ছিল। চলচ্চিত্র দেখার সংস্কৃতি ছিল এ জনপদে। এফডিসি কেন্দ্রীক কিছু ভালো ছবির ব্যবসা সফলতা তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়। তখন বেদের মেয়ে জোসনা, সংগ্রাম, ওরা এগারো জন, সুতরাং, সারেং বৌ এর মতো ছবি তৈরি হয়েছে। কিন্তু ২০০০ সালের পরে সিনেমাতে চলে আসে অশ্লীল এক ধারা। যা চলে ২০০৭ অবধি। তখন বাঙালি মধ্যবিত্ত সিনেমা থেকে দূরে সরে আসে। এরপর বাংলা চলচ্চিত্রে দর্শক আর সিনেমা হলে টেনে আনা সম্ভব হয়নি। এখন অশ্লীলতা না থাকলেও মান সম্পন্ন ছবি তৈরি হচ্ছে না। সিনেমা হল ভেঙে তৈরি হচ্ছে মার্কেট। যে সব সিনেমা হল আছে তাতে ভালো পরিবেশ নেই। তার ওপর আছে তথাকথিত সেন্সর বোর্ডের ঝামেলা।

এমতাবস্থায় দেশ বিদেশে নিজেদের ছবিগুলোকে চেনাতে ও নিজেদের কথা স্বাধীনভাবে বলতে স্বল্পদৈর্ঘ্যই ভরসা। সে স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি যদি হাতপাকানোর মাধ্যম হিসেবে রূপান্তরিত হয়, তবে তা হবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য বেদনাদায়ক। একটি চলচ্চিত্রপ্রেমী জাতি এক দিনে গড়ে ওঠে না। কেবল চলচ্চিত্র তৈরিই নয়, চলচ্চিত্র পাঠ, দেখার সংস্কৃতি, আন্দোলন, চলচ্চিত্রকর্মী তৈরি, ছবি দেখানোর ধারাÑসবকিছু মিলে তৈরি হয় চলচ্চিত্র সংস্কৃতি। অবশ্য এটা যে কেবল এই সময়ের সমস্যা তা নয়। এ সমস্যা ছিল আগেও। বর্তমানে তা ক্যামেরার সহজলভ্যতায় রুপ নিয়েছে মহীরুহে।

অগ্রজ চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল ১৯৮৮ সালে লেখা ‘বাংলাদেশের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র: বিকল্প চলচ্চিত্রের সন্ধানে’ প্রবন্ধে লেখেন, ‘যে সব ছবি হচ্ছে সেগুলোর এক বড় সমস্যা দেখা যাচ্ছে যে, প্রাথমিক আবেগটা বড্ড বেশি। ঘিনঘিনে কাঁচা এক মধ্যবিত্তীয় আবেগ। শিল্প হয়ে ওঠার জন্যে আবেগকে পরিশীলিত করার যে ধৈর্য্য ও মননের প্রয়োজন, তা অনেক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রেই নেই। দর্শকের মননের উপর যে আস্থার প্রয়োজন, নেই সেটাও। আর অধিকাংশ ছবিই হচ্ছে কোনো একটি ‘সমস্যা’ ধরে-শিশুশ্রম, মাদকাসক্তি, নারীমুক্তি ইত্যাদি। এর ইতিবাচক সম্ভাবনা থাকলেও এবং সমস্যা ভিত্তিক ধ্রুপদী চলচ্চিত্র বিশ্বে প্রচুর নির্মিত হলেও যেটা প্রশ্ন, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হবে কি শুধুই কোনো সমস্যার রিপোর্টাজ? জীবনগভীর শিল্প কি হবে না সৃষ্টি?’

১৯৮৮ সালের এই অগ্রজের কথার প্রতিফলন আজকের সর্বত্র। নাটকের জায়গাগুলো বিদেশি সিরিয়াল দখল করেছে। বিষয়ের মান ঠিক না করে, টিভি নাটক যে বেনিয়াদের হাতের মুঠোয়, তাদের হাত থেকে বের করার প্রয়াস না করে, তাঁরা নামছেন আন্দোলনে। এই ছন্নছাড়া সময়ে পেটের ভাত জোগাতে পরিচালকরা বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানীর নিবেদনে তৈরি করছে কিছু টেলিভিডিও। যা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নামে চলছে টেলিভিশনগুলোতে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, এই চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সিংহভাগ তরুণ। যাঁদের চলচ্চিত্র নিয়ে পঠন পাঠনের সময়। এই সময়টাতেই সে ভুল জিনিস তৈরি করে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, ভুল পথে চালিত করছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের নামে বিভ্রান্ত করছে দর্শকদের। বেশির ভাগ চলচ্চিত্রের ভিডিও ছাড়া অন্য কিছুরই কোনো মৌলিকতা নেই। বিশেষ করে আবহ সংগীত। চলচ্চিত্রের আবহ সংগীত নাটকের মতো কপি করে কারও সংগীত লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে চলচ্চিত্রের মান থাকছে না। তাছাড়া কপি রাইট আইনও নৈতিকভাবে একজন চলচ্চিত্রকার মানছেন না।

এই পরিস্থিতিতে স্বল্পদৈর্ঘ্য কেমন হওয়া উচিত এই প্রশ্নটিই ঘুরে ফিরে আসে। সেক্ষেত্রে একটি সমস্যা দাঁড়ায়। তা হলো, আসলে শিল্পের কোনো ব্যাকরণ নেই। কোনো ফ্রেমে বন্দী করে শিল্পকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। তবে লুমিয়ের ভাইদের থেকে আজ পর্যন্ত চলচ্চিত্রের এই দীর্ঘ পথচলায় স্বল্পদৈর্ঘ্যরে একটি ইতিহাস দাঁড়িয়েছে। সেই ইতিহাসের ধারা ও চলচ্চিত্রকারদের আলোচনা, বক্তব্য, তর্ক-বিতর্ক আর নিজস্ব চলচ্চিত্র ভঙ্গি বিশ্লেষণ করে আমরা পৌঁছাতে পারি স্বল্পদৈর্ঘ্যরে একটি সংজ্ঞা দাঁড় করাতে। কিংবা স্বল্পদৈর্ঘ্য বুঝতে অথবা কেমন হওয়া উচিত একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, সে ব্যাখ্যা জানতে।

পশ্চিমাদের কাছে চলচ্চিত্রের শুরু হওয়ায় তাদের পরিভাষা দিয়েই শুরু করা যাক। পশ্চিমে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘শর্ট ফিল্ম’ ‘শর্ট’ ‘শর্ট সাবজেক্ট’, ‘নন প্রফিট ফিল্ম’ ‘লো বাজেট ফিল্ম’, ‘নো বাজেট ফিল্ম’ নামে পরিচিত। কোথাও কোথাও আঞ্চলিক নামেও পরিচিত। যেমন কানাডাতে ‘শর্ট ফিল্ম ফেস অব’ নামে স্বল্পদৈর্ঘ্যরে একটি আলাদা প্রকল্প আছে। ইন্দোনেশিয়াতে ‘মিনিকিনো’ নামে স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রদর্শন ও প্রচারের একটি প্রকল্প আছে।

স্বল্পদৈর্ঘ্যই যেহেতু পরিচয় তাই পশ্চিমাসহ অনেকেই মনে করেন শুধু দৈর্ঘ্যে ছোট হলেই তাঁর নাম দেওয়া যায় স্বল্পদৈর্ঘ্য। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। কেন? সে আমাদের আলোচনায় আশা করি পরিষ্কার হবে। তবুও অনেক জাঁদরেল প্রতিষ্ঠানই এই দৈর্ঘ্য দিয়েই স্বল্পদৈর্ঘ্যরে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছেন। চলুন আগে সেটি জেনে নেই।

অ্যাকাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস (অস্কার) স্বল্পদৈর্ঘ্যকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে A short film is defined as an original motion picture that has a running time of 40 minutes or less, including all credits. ক্রেডিটসহ একটি চলচ্চিত্রের দৈর্ঘ্য ৪০ মিনিট হলেই তাঁকে স্বল্পদৈর্ঘ্য বলা যায় অস্কারের মতে।

১২তম সাবিনা ইন্টারন্যাশনাল শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল স্বল্পদৈর্ঘ্যকে সংজ্ঞায়িত করেছে Cinematographic length – a Definition of the Short Film: Length of film, or parts of a film, expressed in meters. Professional 35mm film passes through the projector at a rate of 24 frames per second, thus a minute of film corresponds to 27.36 meters, an hour to 1641.6 meters. On this basis films are divided into full length (70 minutes and above), medium length (50 – 70 minutes), and short films (15 – 20 minutes)

চিত্রনাট্যের পরিভাষায় তাঁরা স্বল্পদৈর্ঘ্যরে সংজ্ঞায়ন করেছেন ছবির দৈর্ঘ্য মেপে। সেই সঙ্গে আছে প্রজেকশন রেট ও ফ্রেম রেট। এই বিবেচনায় স্বল্পদৈর্ঘ্যরে ছবির দৈর্ঘ্য হলো ১৫ থেকে ২০ মিনিট। তবে এই কথা বলার ঠিক পরেই বলা হয়েছে-

According to many experts there is no fundamental difference between full-length and short films, as can be seen from the many directors who move easily from one medium to another without great stylistic changes. The important point is to communicate a particular vision of the world. The short film does not have to be an anonymous document, but the synthesis of an intellectual process communicating a personal message.

চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের কাছে স্বল্পদৈর্ঘ্য ও পূর্ণদৈর্ঘ্যরে মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। তাঁরা অনেকেই কোনো প্রকারের বড় রীতিগত পরিবর্তন না এনেই এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে গল্প বলেছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যে বিশ্বকে আপনি কতটা নিজস্ব ভঙ্গিতে দেখতে পেরেছেন সেটি। আসলে স্বল্পদৈর্ঘ্য শুধু একটি পরিচয়হীন প্রামাণ্য দলিল না। এটি আসলে একটি বিষয়কে তুলে ধরতে শৈল্পিক ও বুদ্ধিগত প্রক্রিয়ার সমন্বয় সাধন।

১৯৪০ সালে ফ্রান্সে চলচ্চিত্র নিয়ে একটি আইন পাশ হয়। ১৯৬৪ সালে আরেকটি আইন পাশ হয়। সেখানে বলা হয়, ৬০ মিনিটের কম দৈর্ঘ্যরে ছবি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি হিসেবে ধরা হবে।

অবশ্য অনেকে সাহিত্যের বিভিন্ন ধারার সঙ্গেও চলচ্চিত্রকে ভাগ করেছেন। যেমন শর্ট স্টোরি, নোভেল্যা, নোভেল। অর্থাৎ অনেকেই বলতে চেয়েছেন দৈর্ঘ্যে নয়, আঙ্গিকে স্বল্পদৈর্ঘ্যরে পরিচয়। এ বিষয়ে বাংলা পিডিয়াতে স্বল্পদৈর্ঘ্য অধ্যায়ে লেখা হয়েছে, ‘হলিউডের দু-আড়াই ঘন্টা কাল বা তার চেয়েও বেশি দৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্রের ধারাতেই উপমহাদেশে পূর্ণদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্র নির্মিত হতে থাকে। আমাদের দেশেও পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রের জন্য সাধারণ মান হিসেবে আড়াই ঘন্টাকে বিবেচনা করা হয়। ৩৫ মিলিমিটারে এসব চলচ্চিত্র বানানো হয়। এ ধরণের চলচ্চিত্রের নির্মাণ ব্যয় অনেক বেশি। এ কারণে নির্মাতাকে অতিমাত্রায় পুঁজি লগ্নিকারীর ওপর নির্ভর করতে হয়। পুঁজি লগ্নিকারীর কাছে নান্দনিকতা গৌণ বলে গণ্য হবার সম্ভাবনা থাকে। তার কাছে লগ্নি কার পুঁজি লাভসহ ফেরত পাওয়ার চিন্তা মুখ্য হওয়া স্বাভাবিক। অতি বাণিজ্যিকীকরণের ফলে চলচ্চিত্রের মান বিনষ্ট হয়। এসব বিবেচনায় আমাদের দেশের কিছু উদ্যমী ব্যক্তি মূলধারার অর্থাৎ এফডিসি কেন্দ্রীক নির্মাণধারার বাইরে গিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্যোগী হন।.. এসব ছবিতে যৌনতা, নিষ্ঠুরতা ও ভাঁড়ামোর মতো অপ্রজোয়নীয় বাণিজ্যিক উপাদান সংযোজন করে ছবির দৈর্ঘ্য বাড়ানোর প্রয়াস নেই। জীবন ঘনিষ্ঠ এমন অনেক বিষয় নিয়ে এ ধারার নির্মাতারা ছবি নির্মাণ করেন। ..এভাবে নির্মিত চলচ্চিত্রকে দৈর্ঘ্য নির্বিশেষে এখন স্বল্পদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্র বলা হচ্ছে। নদীর নাম মধুমিতর দৈর্ঘ্য সোয়া দু ঘণ্টা হলেও তা এ কারণেই স্বল্পদৈর্ঘ্যের বলে চিহ্নিত।’

তবে ঠিক ঢালাও ভাবে বাংলাপিডিয়ার কথাটিকে স্বল্পদৈর্ঘ্যরে মান সংজ্ঞা হিসেবে ধরা যায় না। কারণ শুধু জীবন ঘনিষ্ঠ ও মূল ধারার বাইরে নির্মিত হলেই যে তাঁকে স্বল্পদৈর্ঘ্য বলতে হবে, এমন কোনো কারণ নেই। তবে একটি ধারণা অবশ্যই পাওয়া যায়।

স্বল্পদৈর্ঘ্যরে সংজ্ঞায়নে আমরা যদি দৈর্ঘ্য, আঙ্গিক ও নির্মাণ প্রক্রিয়াসহ বিষয়টিকে সোজাভাবে সংজ্ঞায়ন না করে বোঝার চেষ্টা করি, তাহলে মনে হয় বেশি ভালো। সেক্ষেত্রে সাহিত্যের সংজ্ঞায় যে উদাহরণটি টানা হয়েছে তাকে উল্লেখ করা যেতে পারে। ইংরেজিতে শর্ট স্টোরিকে বলা হচ্ছে স্বল্পদৈর্ঘ্যরে অপর নাম হিসেবে। সে দিকে লক্ষ্য রেখে বাংলায় ছোট গল্পকে আমরা চলচ্চিত্রের সাহিত্যিক রূপ হিসেবে ধরতে পারি। রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের সংজ্ঞা দিয়েই শুরু করা যাক স্বল্পদৈর্ঘ্যরে সঙ্গে বোঝাপড়া।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছোটগল্প নিয়ে বলেন,

‘ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখ কথা
নিতান্তই সহজ সরল
নাহি বর্ণনার ছটা, নাহি ঘটনার ঘনঘটা
নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ
অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে
শেষ হয়ে হইল না শেষ’

রবীন্দ্রনাথের এই কথাগুলো কেউ যদি চলচ্চিত্রের ব্যাপারে বুঝতে পারেন, তবে স্বল্পদৈর্ঘ্যের পরিচয় নিয়ে তাঁর কাছে আর কোনো ধোঁয়াশা থাকার কথা নয়। ছোট গল্পের রূপরেখা রবীবাবু কত শব্দের হবে, কত পৃষ্ঠার হবে তা কিন্তু বলেননি। বলেছেন গল্পের ব্যাপারটি কেমন হবে। ধরনটি কেমন হবে। পাঠকের কাছে কেমন লাগবে। স্বল্পদৈর্ঘ্যরে ব্যাপারটিও তাই। দৈর্ঘ্য মেপে স্বল্পদৈর্ঘ্যরে সংজ্ঞায়ন চলে না। চলচ্চিত্রের ভাব ও তাঁর ভাষায় হবে আলাদা বৈশিষ্ট্যের। যা উপরের কথাগুলোকে প্রতিফলিত করে। ছোট গল্প যেমন এক পৃষ্ঠারও হতে পারে আবার পাঁচ পৃষ্ঠারও হতে পারে। তেমনি স্বল্প দৈর্ঘ্যরে একটি সিনেমা এক মিনিটও হতে পারে আবার ৫০ মিনিটেরও হতে পারে। তাঁর ভাষা বলে দেবে সে আসলে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। শেষ করতে চাই বাংলাদেশের দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্যরে উদাহরণ দিয়ে। ১৯৭১ সালে জহির রায়হান তৈরি করেন বাংলাদেশের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য। যার দৈর্ঘ্য ছিল ২০ মিনিট। আবার তাঁর এক উত্তরসূরী তারেক মাসুদ ঠিক আঠার বছর পরে ১৯৮৯ সালে তৈরি করেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আদম সুরত’। যার দৈর্ঘ্য ছিল ৫৪ মিনিট।