আন্দ্রেই তারকোভস্কি ছিলেন সিনেমার কবি। এ পর্যন্ত কাব্যিক ও আধ্যাত্মিক সিনেমা নির্মাণে তাঁর কাছাকাছি কাউকেই পাওয়া যায়নি। তার কাছে সিনেমা বানানোটা কোনো বিনোদন নয়। সিনেমা বানানোর পুরো প্রক্রিয়াটা ছিল একটি শৈল্পিক জীবন যাপন। তাঁকে সবচেয়ে শিক্ষিত পরিচালক হিসেবে ধরা হয়।

চলচ্চিত্রে আসার আগে সংগীত ও চিত্রকলার ওপর লেখাপড়া করেছেন। বাবা ছিলেন কবি, মা প্রুফ রিডার। সিনেমা তাঁর কাছে শুধু বাস্তবের প্রতিফলন নয়, ছিল তার চেয়েও বেশি কিছু ঠিক যেমন কবিতা কিংবা স্বপ্ন।

সিনেমা জীবন

দ্য স্টেট ইনস্টিটিউট অব সিনেমাটোগ্রাফি (ভিজিআইকে) দিয়ে তারকোভস্কির সিনেমাযাত্রা শুরু। এটি রাশিয়ার তৎকালীন সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম। তারকোভস্কি পরিচালনায় ভর্তি হন। ক্রুশ্চেভের সময়ে রাশিয়াতে তরুণ চলচ্চিত্রকারদের জন্য কাজ করার বেশ সুযোগ ছিল।

১৯৫৩ সালের আগে খুবই কম সিনেমা বানানো হতো। নতুন চলচ্চিত্রকারদের হাতে প্রচুর সিনেমা তৈরি হয়। ক্রুশ্চেভের সময়ে পশ্চিমা সংস্কৃতি, শিল্প সাহিত্যেও দুয়ার কিছুটা হলেও খুলে দেওয়া হয়। এটা বিশ্বের চলচ্চিত্র ও শিল্প সম্পর্কে জানতে তারকোভস্কির জন্য বিশাল সুযোগ হিসেবে চলে আসে।

তারকোভস্কি পরিচিত হন ইতালির নিও রিয়ালজম, ফরাসি নিউ ওয়েভ সিনেমা ধারা এবং কুরোসাওয়া, বুনুয়েল, বার্গম্যান, ব্রেসোঁর মতো পরিচালকদের সঙ্গে। এই পরিচালকেরা তারকোভস্কিকে চলচ্চিত্র নির্মাণে বেশ ভাবায়।

তারকোভস্কির শিক্ষক ও গুরু ছিলেন মিখাইল রোম। ১৯৫৬ সালে তারকোভস্কি তার প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য ‘দ্য কিলার’ বানান। আর্নেস্ট হোমিংওয়ের গল্প অবলম্বনে এটি তৈরি করেন। রাশিয়ার অন্যতম পরিচালক গ্রেগরি চুখরাইও ভিজিআইকেতে পড়াতেন।

তারকোভস্কিকে তার পছন্দ হয়। এবং ‘ক্লিয়ার স্কাইস’ চলচ্চিত্রে সহাকরী পরিচালক হিসেবে তারকোভস্কিকে নিয়ে নেন। প্রথমে তারকোভস্কি আগ্রহ দেখালেও পরবর্তীকালে নিজের পড়ালেখা ও সিনেমা বানানোতে মনযোগ দেন।

১৯৬০ সালে বানান ‘দ্য স্টিমরোলার অ্যান্ড দ্য ভায়োলিন’। পরের বছর নিউ ইয়র্ক স্টুডেন্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবিটি প্রথম পুরস্কার জেতে। ছবিটি দিয়ে তারকোভস্কি নিজের জাত চেনাতে শুরু করেন।

১৯৬২ সালে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে হাত দেন। পরিচালক অ্যাডুয়ার্ড অ্যাবালভ ‘ইভান’স চাইল্ডহুড’ নামে একটি প্রকল্প দাঁড় করান। কিন্তু এই প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে তারকোভস্কি ছবিটি করার সিদ্ধান্ত নেন। বলা যায়, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রথম ছবিতে হাত দিয়েছিলেন তারকোভস্কি।এই বছরেই ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গোল্ডেন লায়ন নিয়ে আসে ছবিটি।

ছবিটি রাশিয়ান লেখক ভ্লাদিমির বোগোমোলভের ‘ইভান’ ছোট গল্প অবলম্বনে তৈরি। ছবিতে তারকোভস্কি শুধু যুদ্ধই দেখাননি। রাশিয়ার কিশোরদের শৈশব কীভাবে যুদ্ধ প্রভাবিত করেছিল তার চমৎকার ব্যাখ্যা ছিল এই ছবি। তাই এটি অন্য যুদ্ধছবিগুলোর মতো না হয়ে আলাদা নতুন বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছিল।

১৯৬৫ সালে তারকোভস্কি নির্মাণ করেন ‘আন্দ্রেই রুবলভ’। পঞ্চদশ শতকের খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী আন্দ্রেই রুবলভের জীবন নিয়ে ছবিটির গল্প। কিন্তু ছবিতে রুবলভের গল্পের থেকে পঞ্চদশ শতকের রাশিয়া উঠে এলো অযাচিতভাবে। এভাবেই একটি জীবনীভিত্তিক ছবি না হয়ে এই ছবিটি হয়ে উঠল তারকোভস্কির সিনেমার কবিতা।

প্রথমে ছবিটি ছিল ২০৫ মিনিটের। বিভিন্ন সময় ছবিটি নিয়ে কাটাছেড়া চলে। শেষমেশ ১৮৩ মিনিটে দাঁড়ায়। সোভিয়েত সরকার তৎকালীন সময়ে ছবিটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালে এটি সোভিয়েত ইউনিয়নে মুক্তি পায়। তবে ১৯৬৯ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ফিপরেস্কি পুরস্কার বাগিয়ে নেয় ছবিটি।

১৯৭২ সালে করেন ‘সোলারিস। স্তানিস্ল লেমের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হয়েছে ছবিটি। যদিও উপন্যাসের চিত্রায়ন না করে তারকোভস্কি মহাকাশে জীবন যাপন নিয়ে নিজের ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন ছবিটিতে। ছবিটির চিত্রনাট্য নিয়ে ১৯৬৮ সাল থেকে কাজ শুরু করেন ফ্রেদরিখ গোরেনস্তেইনের সঙ্গে । ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়। গ্রান্ড প্রিক্স স্পেশাল দু জুরি এবং ফিপরেস্কি পুরস্কার জিতে নেয়, মনোনয়ন পায় পাম দ’রের জন্য।

১৯৭৩ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বানান ‘মিরর’। তারকোভস্কি মঞ্চেও কাজ করেন। ১৯৭৬ সালে শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’ নাটকের নির্দেশনা দেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন রাশিয়াতে তারকোভস্কির শেষ ছবি ‘স্টকার’। রোডসাইড পিকনিক উপন্যাস অবলম্বনে ছবিটি শেষ হয় ১৯৭৯ সালে। ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে ইকিউমেনিকাল পুরস্কার জেতে।

১৯৭৯ সালে তারকোভস্কি ইতালি সফর করেন। সখোনে তৈরি করেন প্রামাণ্যচিত্র ‘ভয়েজে ইন টাইম’। ১৯৮২ সালে তারকোভস্কি বানান ‘নস্টালজিয়া। ১৯৮৩ সালে এটি কানে ফিপরেস্কি পুরস্কার জেতে। এবং তাঁর প্রিয় পরিচালক রবার্ট ব্রেসোঁর সঙ্গে গ্রান্ড প্রিক্স দু সিনেমা দ্য ক্রিয়েশন পুরস্কার জেতে।

১৯৮৪ সালের দিকে তিনি শেষ ছবি ‘দ্য সেক্রিফাইস করার পরিকল্পনা করেন। ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে ফিপরেস্কি ও গ্রান্ড প্রিক্স স্পেশাল দ্য জুরি পুরস্কার জেতে।

ব্যক্তিগত জীবন

আন্দ্রেই আর্সেনেভিচ তারকোভস্কির জন্ম ১৯৩২ সালের ৪ এপ্রিল ইভানোভো অবলাস্ট এর জাভরেজি গ্রামে। ইউক্রেনিয়ার বাবা আর্সনেই আলেকজান্দ্রোভিচ তারকোভস্কি ছিলেন রাশিয়ার বিখ্যাত কবি। মা মারিয়া ইভানোভা ভিশনিয়াকোভা ম্যাক্সিম গোর্কি লিটারেচার ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক। কাজ করতেন প্রুফ রিডার হিসেবে।

তারকোভস্কির শৈশব কাটে ইউরজেভেতসে। ১৯৩৭ সালে তার বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যায়। তারকোভস্কির জীবনে বাবার এই চলে যাওয়া বেশ প্রভাব ফেলে। তার মা মস্কোর একটি প্রেসে প্রুফ রিডিংয়ের কাজ করতেন। তারকোভস্কি ও তাঁর বোন সেখানে মায়ের সঙ্গে চলে যান। ১৯৩৯ সালে স্কুলে ভর্তি হন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে আবার ইউরজেভেতসে চলে আসেন। নানির সঙ্গে থাকা শুরু করেন। ১৯৪৩ সালে আবার পরিবারসহ মস্কো চলে আসেন। তারকোভস্কির বাবা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। ভাঙা পা নিয়ে আবার পরিবারের কাছে ফিরে আসে।

তারকোভস্কির মা চেয়েছিলেন তার ছেলে শিল্পকলা ও সংগীত নিয়ে লেখা পড়া করবে। তিনি সংগীত বিদ্যালয়ে পিয়ানো শেখা শুরু করেন। পাশাপাশি আঁকাআঁকির বিদ্যালয়েও ভর্তি হন। তারকোভস্কি সাহিত্যের প্রতি খুব দুর্বল ছিলেন। বিশেষ করে কবিতা।

১৯৫১ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত উচ্চ মাধ্যমিক পড়েন। এরপর আরবি পড়তে শুরু করেন ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউিট অব মস্কোতে। পরে এই বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আর শেষ করেননি। এরপর একটি গবেষণার কাজে যুক্ত হন। এই সময় তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি চলচ্চিত্র নিয়ে পড়ালেখা করবেন।

১৯৫৪ সালে সেখান থেকে ফিরে আসার পর তিনি ভর্তি হন দ্য স্টেট ইনস্টিটিউট অব সিনেমাটোগ্রফিতে (ভিজিআইকে)। এই ইনস্টিটিউট থেকেই তারকোভস্কির চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু হয়।

তারকোভস্কি দুটি বিয়ে করেন। প্রথম বিয়ে ১৯৫৭ সালে। ইরমা রৌচকে। ইরমা তার সঙ্গেই পড়ত। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সে বিয়ে টেকে। এরপর বিয়ে করেন লারিসা কিজিওলোভাকে। তারকোভস্কি ১৯৮৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর ফ্রান্সের প্যারিসে মারা যান।

১৯৮৭ সালের ৩ জানুয়ারি ফ্রান্সের সেইন্ত জেনেভিভে দে বোই-তে সমাহিত করা হয় তাঁকে। ১৯৯০ সালের দিকে তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে একটি বিতর্কের শুরু হয়। মনে করা হয়, স্বাভাবিকভাবে তাঁর মৃত্যু হয়নি। তাকে কেজিবি রাশিয়ার মূল নিরাপত্তা বিভাগ মেরে ফেলে।