৭৫তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘কান ক্ল্যাসিকস’ বিভাগে দেখানো হবে বিশ্ব চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান নির্মাতাদের ছবি। আছে ভারতের সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ও ইতালির ভিত্তরিও ডি সিকার ‘সুশাইন’ ছবি দুটি।

ভারতকে কান চলচ্চিত্র উৎসবের সম্মাননা

এবার কান চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ মনযোগ দেওয়া হচ্ছে ভারতের প্রতি। সে কারণে এবারের উৎসবে ভারতের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো।

ইতিমধ্যে উৎসবে বিচারক হিসেবে নাম লিখিয়েছেন দীপিকা পাড়ুকোন। আর প্রদর্শনী করা হবে সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ আর অরবিন্দ গোবিন্দ পরিচালিত ‘দ্য সার্কাস টেন্ট’।

ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (এনএফডিসি) ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ছবিটি কানে পাঠাচ্ছে। ভারত সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে জাতীয় চলচ্চিত্র ঐতিহ্য মিশন প্রকল্পের অংশ হিসেবে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।

ছবিটি ৩৫ মিলিমিটার ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিল। সেই নেগেটিভকে ফোরকে রেজোল্যুশনে স্ক্যান করেছে সংশ্লিষ্টরা। মূল ৩৫ মিমি সাউন্ড নেগেটিভ সরবরাহ করেছেন ছবিটির প্রযোজক পূর্ণিমা দত্ত।

যদিও নেগেটিভের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে ৩৫ মিমি রিলিজ প্রিন্ট থেকে সেসব স্ক্যান করা হয়েছে। মুম্বাইয়ের প্রাইম ফোকাস টেকনোলজিস পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করে।

গ্রেডিং তত্ত্বাবধান করেছেন ভারতীয় চিত্রগ্রাহক সুদীপ চ্যাটার্জি। ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অব ইন্ডিয়ায় সংরক্ষিত রয়েছে এটি।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত বাংলা ছবি ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ মুক্তি পায় ১৯৭০ সালে। ছবিটির ব্যাপ্তি ১ ঘণ্টা ৪৯ মিনিট। এটি সত্যজিত রায়ের কলকাতা ত্রয়ীর প্রথম ছবি।

ছবির গল্প সিদ্ধার্থ নামের একজন শিক্ষিত মধ্যবিত্তকে কেন্দ্র করে, যিনি সামাজিক অস্থিরতায় হিমশিম খান। ব্যাপক দুর্নীতি এবং বেকারত্বের মাঝে বিপ্লবী কর্মী ভাই কিংবা ক্যারিয়ারে ডুবে থাকা বোনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেন না তিনি।

বলা হয়ে থাকে, ফটো-নেগেটিভ ফ্ল্যাশব্যাকের মতো কৌশল নিয়ে নিরীক্ষার জন্য কালজয়ী হয়ে আছে সত্যজিৎ রায়ের ছবিটি।

ছবিটিতে সিদ্ধার্থ চরিত্রে অভিনয় করেছেন ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বিপরীতে কেয়া চরিত্রে ছিলেন জয়শ্রী রায়। তিনি বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে জয়শ্রী কবির নামে পরিচিত।

আলমগীর কবিরের পরিচালনায় ‘সূর্য কন্যা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য বাংলাদেশে আসেন জয়শ্রী। এরপর তারা বিয়ে করেন। আলমগীর কবিরের পরিচালনায় ‘সীমানা পেরিয়ে’ (১৯৭৭), রূপালী সৈকতে (১৯৭৯) ও মোহনা (১৯৮২) ছবিতে অভিনয় করেছেন জয়শ্রী রায়।

উদ্বোধনী ছবি

কান চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী ছবি হিসেবে দেখানো হবে ফরাসি পরিচালক জ্যঁ ইসটাশের ‘দ্য মাদার অ্যান্ড দ্য হোর’। উৎসবের ওয়েব সাইটে এটি লেখা হয়েছে।

পালে দে ফেস্টিভাল ভবনের সাল দুবুসিতে আগামী ১৭ মে দুপুর ২টায় এটি দেখানো হবে। এর মধ্য দিয়ে ১৯৭২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটির ৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ৫০ বছর উদ্যাপনও বলা যায় এই প্রদর্শনী।

‘সিঙ্গিন’ ইন দ্য রেইন’ ছবির ৭০ বছর পূর্তি

আমেরিকার জেন কেলি ও স্ট্যানলি ডনেন পরিচালিত ‘সিঙ্গিন’ ইন দ্য রেইন’ ছবির ৭০ বছর পূর্তিও উদযাপন করা হবে কান ক্ল্যাসিকসে। এ কারণে রাখা হয়েছে ছবিটির প্রদর্শনী। ছবিটি দারুণ ঝকঝকে প্রিন্টের জন্য ফোরকে রেজোল্যুশনে রূপান্তর করা হয়েছে।

রেস্টোরেশন ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার

পুরোনো ছবিগুলো ঝকঝকে প্রিন্টে দেখতে বিশ্বজুড়ে ফোরকে রেস্টোরেশনের কাজ চলছে। এবার কান চলচ্চিত্র উৎসব এমন ধ্রুপদী বেশ কিছু রূপান্তরিত চলচ্চিত্রের বিশ্ব উদ্বোধন হবে।

এই তালিকায় থাকছে ইতালির ভিত্তোরিও ডি সিকার ‘সুশাইন’ (১৯৪৬), যুক্তরাষ্ট্রের ওরসন ওয়েলেসের ‘দ্য ট্রায়াল’ (১৯৬২), মার্টিন স্করসেজির ‘দ্য লাস্ট ওয়াল্টজ’ (১৯৭৮), ফ্রান্সের বেরথ্রঁ বিয়ের পরিচালিত ‘ইফ আই ওয়্যার আ স্পাই’ (১৯৬৭)।

জুলিয়ান দ্যুভিভিয়ের পরিচালিত ‘রেড হেয়ার’ (১৯৩২), ফিলিপাইনের মাইক ডি লিয়নের ‘আইটিম’, ব্রাজিলের গ্লবের হশা পরিচালিত ‘গড অ্যান্ড ডেভিল ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য সান’ (১৯৬৪), চেক প্রজাতন্ত্রের ভেরা শিতিওভা পরিচালিত ‘ডেইজিস’ (১৯৬৬) এবং স্প্যানিশ পরিচালক ফের্নান্দো আরাবালের ‘লং লিভ ডেথ’(১৯৭১)।

আরও পড়ুন:

প্রামাণ্যচিত্র

প্রামাণ্যচিত্রের মধ্যে কান ক্ল্যাসিকসে আছে আমেরিকান তারকা দম্পতি জোয়ান উডওয়ার্ড ও পল নিউম্যানের ওপর অভিনেতা-নির্মাতা ইথান হকের ‘দ্য লাস্ট মুভি স্টারস’-এর তৃতীয় ও চতুর্থ পর্ব, ফরাসি অভিনেত্রী রোমি শ্নাইডারকে কেন্দ্র করে নির্মিত ‘রোমি, অ্যা ফ্রি ওম্যান।

কানের ইতিহাসে নারী হিসেবে প্রথম স্বর্ণপাম জয়ী কিউই পরিচালক জেন ক্যাম্পিয়নের ওপর ইতালির জুলি বের্তোচেল্লির ‘জেন ক্যাম্পিয়ন, সিনেমা ওম্যান’।

ফরাসি অভিনেতা জেহা ফিলিপের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে থাকছে প্যাট্রিক জ্যুডি পরিচালিত ‘জেহা ফিলিপ, দ্য লাস্ট উইন্টার অব দ্য সিআইডি’। চিত্রকর গয়াকে নিয়ে প্রয়াত ফরাসি ঔপন্যাসিক জ্যঁ-ক্লদ ক্যারিয়েরের গবেষণার ওপর হোসে লুই লোপেজ লিনারেস পরিচালিত ‘দ্য শ্যাডো অব গয়া বাই জ্যঁ-ক্লদ ক্যারিয়ের’।

আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি নির্মাতা ফের্নান্দো সোলানাসের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকবে তার ওপর নির্মিত ‘থ্রি ইন দ্য ড্রিফট অব দ্য ক্রিয়েটিভ অ্যাক্ট’।

মেয়েদের চোখে বাবার গল্প নিয়ে রয়েছে দুটি প্রামাণ্যচিত্র। এর মধ্যে আলেকসঁন্দ মোয়া পরিচালিত ‘প্যাট্রিক দ্যুবেয়ার, মাই হিরো’তে ফরাসি পরিচালক প্যাট্রিক দ্যুবেয়ারকে নিয়ে বলেছেন তার মেয়ে। অন্যটি হলো মালির পরিচালক সুলেমান সিসের ওপর তার মেয়ে অভিনেত্রী ফাতু সিসের ‘অ্যা ডটার’স ট্রিবিউট টু হার ফাদার’।

আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সঙ্গে কাজ করছে কান উৎসব কর্তৃপক্ষ। এর অংশ হিসেবে ২০২১ সালে টোকিওতে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক গেমসের অফিসিয়াল প্রামাণ্যচিত্র রয়েছে কান ক্ল্যাসিকসে। এটি নির্মাণ করেন জাপানের নাওমি কাওয়াসে।

১৯৭৩ সালে কানে প্রতিযোগিতা শাখার বাইরে প্রদর্শিত ‘ভিশনস অব এইট’ প্রামাণ্যচিত্র তৃতীয়বারের মতো দেখানো হবে এবারের আসরে। ২০১৩ সালেও কান ক্ল্যাসিকসে প্রদর্শিত হয়েছে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমসের ওপর এই প্রামাণ্য চলচ্চিত্র। এটি পরিচালনা করেছেন আট জন নির্মাতা।

আগামী ১৭ মে শুরু হবে ৭৫তম কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। চলবে ২৮ মে পর্যন্ত।