আইন কী? কিংবা বিচার কী? আদতে আইনের শিক্ষার্থীদের জানার বিষয়। তবুও আমরা যাঁরা আম জনতা, তাদেরও এ বিষয়ে জানা থাকাটা শুধু দরকারিই নয়, কর্তব্য। কারণ আইনের প্যাঁচে পড়ে সহায় সম্বল হারিয়ে নি:স্ব হয়েছেন এ গল্প আছে। অনেকেই তাই কোর্ট-কাচারির আশ-পাশও মাড়ান না।
আর আইনজীবীদের অনেকেই এড়িয়ে চলতে ভালোবাসেন। আবার কেউ কেউ মারাত্মক অপরাধ করেও বেরিয়ে আসেন আইনের বিভিন্ন কলাকানুন পেরিয়ে। তাই আইন ও বিচার নিয়ে সাধারণ জ্ঞান থাকাটা খুব জরুরি।
চলচ্চিত্র: সেকশন ৩৭৫
পরিচালক: অজয় বহেল
কলাকুশলী: অক্ষয় খান্না, রিচা চাড্ডা, মিরা চোপড়া, রাহুল ভাট, কিশোর কদম প্রমুখ।
দেশ: ভারত
সাল: ২০১৯
রেটিং: ৬/১০
আইন ও বিচার নিয়ে জানতে আইনজীবীদেরু রুমে থাকা মোটামোটা আইনের বই পড়ার দরকার নেই। অন্তত সাধারণ জ্ঞানে আইন বলতে কী বোঝায় আর বিচার বলতে কী বোঝায়, তা আমাদের মতো আম জনতাকে শেখাতে বলিউড পরিচালক অজয় বহেল বানিয়েছেন সেকশন ৩৭৫ নামের একটি সিনেমা। মোটা বই পড়ার বিরক্তি নয়, সিনেমা দেখার আনন্দ নিয়েই জানতে পারবেন আইন ও বিচার নিয়ে।
সেকশন ৩৭৫ সিনেমার দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
এত গেল একেবারে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা। তাহলে যিনি নিছক সিনেমা দেখতে চান? তার জন্য কি এই সিনেমা নয়? অবশ্যই। নিছক সিনেমা দেখতে চাইলেও আপনার জন্য টাটকা রেসিপি ছবিটি। এই ছবির মধ্যে সিনেমা আর বিনোদনের সকল উপাদানই বিদ্যমান। তার সঙ্গে যদি আপনি একটু মনযোগী হন তবে আইন নিয়েও সম্যক ধারণা পাবেন।
পরিচালক মূলত, আইন কি? ও বিচার কি? আইন ও বিচার কি এক? এমন নানা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। এবং তার উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই শেষ হয়েছে সিনেমাটি। পরিচালক এই দুটি বিষয় খোলাসার জন্য একটি গল্প ফেঁদেছেন। আর থিম হিসেবে নিয়েছেন ভারতের সবচেয়ে বড় সমস্যা ধর্ষণের মতো বিষয়টি।
ভারতের বিখ্যাত পরিচালক রোহান খুরানা আটক হয়েছেন তাঁরই ইউনিটের জুনিয়র কস্টিউম ডিজাইনার অঞ্জলি ডাংলেকে ধর্ষণ করার অভিযোগে। আদালতে একের পর এক শুনানি চলছে। রোহানের পক্ষে লড়ছেন বিখ্যাত ব্যারিস্টার তরুণ সালুজা। আর অঞ্জলির পক্ষে লড়ছেন তরুণ আইনজীবী সালুজারই ছাত্রী হিরাল গান্ধী।
অঞ্জলি ডাংলে চরিত্রে অভিনয় করেছেন মীরা চোপড়া। ছবি: ইনস্টাগ্রাম
আদালতে শুনানি চলে। সাক্ষী প্রমাণ উপস্থাপিত হলে এটা প্রায় প্রমাণিত হয়ে যায় যে রোহান ধর্ষণ করেছেন অঞ্জলিকে। কিন্তু রায় ঘোষণার ঠিক আগেই ঘটতে থাকে মজার ঘটনা। ব্যারিস্টার তরুণ নানা সব যুক্তি দাঁড় করিয়ে প্রমাণ করেন যে রোহান ধর্ষণ করেননি। ওটা ছিল অ্যাগ্রেসিভ সেক্স। ধন্দে পড়ে যান বিচারকেরা।
দুই বিচারক মানতে বাধ্য হন রোহানের বিপক্ষে যেমন যুক্তি আছে, তেমনি সমান যুক্তি আছে রোহানের পক্ষেও। বিচারকেরা কী রায় দেবেন?
এদিকে অঞ্জলির পক্ষে চলে নারীবাদী আন্দোলন। তরুণ সালুজার মুখে ছিটানো হয় কালী। এমনকি স্বয়ং স্ত্রী তরুণকে বলেন, তোমার নিজেরও একটি মেয়ে আছে? তাহলে কী করে তুমি একজন ধর্ষকের পক্ষে আদালতে লড়তে পার? তরুণ সালুজার উত্তরের মধ্য দিয়ে পরিচালক দর্শককে শিখিয়ে দেন আইনের পরিচয় কী?
তরুণ উত্তরে বলেন, আইন মানবিকতা দেখে না। আইন মানে ফ্যাক্ট। সাক্ষী প্রমাণ। তার উপরে কথা বলে আইন। প্রমাণ যদি রোহানের পক্ষে যায়? তাহলে? এখনো সে দোষী সাব্যস্ত হয়নি। তাঁর অধিকার আছে নিজের পক্ষে কথা বলার। এটা নাগরিক হিসেবে তাঁর প্রাপ্য।
তাহলে আইন কী? আইন ও বিচার কি এক? তার জন্য দেখতে হবে ছবিটি। এবার আসুন বিচার নিয়ে কিছু কথা বলি। রোহানের পক্ষে ও বিপক্ষে দুই দিকেই সমান প্রমাণ। তবে বিচারে কী রায় দিবেন বিচারকেরা। শুনানির শেষ দিন। বিচারকেরা দেখলেন দুই পক্ষেই সমান প্রমাণ। তারা ভাবলেন। পরিবেশ দেখলেন। তারপর রায় দিলেন।
তাতে সাজা হলো রোহানের। তার মানে কী দাঁড়ায়। আইন ও বিচার এক নয়। বিচার পরিবেশ, পরিস্থিতি, বিচারকের মন, মানসিকতা কিংবা সময়ের উপর নির্ভর করে। একই অপরাধে তাই আমরা দেখতে পাই, নানা বিচার পায় মানুষ।
সেকশন ৩৭৫ ছবির দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
তাহলে দাঁড়ালো, আইন নির্ভর করে ফ্যাক্টের ওপর। আর বিচার নির্ভর করে নানা কিছুর উপর। আইন সবক্ষেত্রে একই কিন্তু বিচার পরিবেশ, সময় ও নানা বিষয়ের উপর নির্ভর করে। না হলে ছবির শেষে যখন অঞ্জলি ডাংলে দেখেন ধরে নিয়ে যাচ্ছে রোহানকে, তখন অঞ্জলির চোখে জল।
একজন ধর্ষকের সাজা হওয়া দেখে অঞ্জলির চোখে জল কেন? আশ্চর্য হন আইনজীবী হিরাল গান্ধী। কিন্তু অঞ্জলি এবার যে কথা বলেন, তাতে অবাক হয়ে যান তিনি। অঞ্জলি চলে যেতে যেতে বলে, ম্যাম, রোহান আমাকে ধর্ষণ করেনি। তবে যা করেছে তাঁকে ধর্ষণই বলা যায়।
এমন নানা মজার উপাদানে ভরপুর ছবির শেষ পর্যন্ত। অভিনয়ে তরুণ সালুজার চরিত্রে অক্ষয় খান্না অসাধারণ অভিনয় করেছেন। বলিউডের হিরোইজম থেকে বের হয়ে প্রাকৃতিক অভিনয়ে নিজের অভিনয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন এই তারকা অভিনেতা। হিরাল গান্ধি হিসেবে রিচা চাড্ডা সাবলীল।

 

View this post on Instagram

 

A post shared by Meera Chopra (@meerachopra)

প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার দূর সম্পর্কের কাজিন মিরা চোপড়া অঞ্জলি ডাংলের চরিত্রে বেশ ভালো করেছেন। এই ধরনের চরিত্রে সাবলীলতা বেশ মারাত্মক। বিচারক হিসেবে মারাঠি সিনেমার অভিনেতা কিশোর কদম অসাধারণ। অন্য সবার অভিনয় চালিয়ে নেওয়ার মতো।
পরিচালনার মুন্সিয়ানা অতটা দেখাতে পারেননি অজয় বহেল। মাঝে মাঝে দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি বিরক্তি ঘটায়। বাজেট কম থাকায় প্রডাকশন ডিজাইন এবং শিল্প নির্দেশনাও খুব একটা যুতসই না। সিনেমা মানেই আমার কাছে প্রথম কথা দৃশ্যায়ন। দৃশ্যের কাব্যময়তা কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
কোর্টরুম থ্রিলারের টান টান উত্তেজনা, ঘটনার মোড় ঘুরে যাওয়া ছাড়া জীবনের কোনো ছন্দ খুঁজে পাওয়া যায়নি। মনে হয়েছে থিম বলাটাই পরিচালকের উদ্দেশ্য, ছবিতে গল্প কিংবা চরিত্রের প্রাণ অতটা গুরুত্ব নয়। তাই ধর্ষণের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কাজ করলেও আমাদের মনে কোনো ধরনের উপলদ্ধি কাজ করে না।
তথাপি বলিউড সিনেমার জোয়ারে এটি হারিয়ে যাবার মতো সিনেমা নয়। শৈল্পিক বিচারে উত্তীর্ণ না হলেও টান টান উত্তেজনার থ্রিলার আর কোর্টরুম ড্রামা হিসেবে নিশ্চয়ই জায়গা করে নেবে বিশ্ব চলচ্চিত্রে।